একীভূত পাঁচ ব্যাংকের দুই বছরের মুনাফা বাতিলের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক
দেশের ব্যাংকিং খাতে বড় ধরণের পরিবর্তনের অংশ হিসেবে পাঁচটি ইসলামী ব্যাংকের আমানতকারীদের জন্য এক কঠিন বার্তা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২০২৪ এবং ২০২৫ সালে এসব ব্যাংকে জমা রাখা অর্থের বিপরীতে কোনো মুনাফা দেওয়া হবে না। আন্তর্জাতিক রীতিনীতি এবং ব্যাংক রেজুলেশন স্কিমের আওতায় এই ‘হেয়ারকাট’ বা মুনাফা কর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এটি মূলত আর্থিক খাতের দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার একটি বিশেষ প্রক্রিয়া। এর ফলে আমানতকারীরা তাদের মূল আমানত পেলেও ওই দুই বছরের কোনো লাভ বা মুনাফা দাবি করতে পারবেন না।
সংকট মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উদ্যোগ
ব্যাংকগুলোর সংকট কাটাতে এবং একীভূতকরণ প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে গত বুধবার সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর প্রশাসকদের কাছে বিশেষ নির্দেশনা পাঠানো হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে পাঠানো ওই চিঠিতে সব আমানতকারীর হিসাব নতুন করে গণনা করার জন্য কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে যে, বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ব্যাংক একীভূত করার সময় এই ধরণের পদ্ধতি নিয়মিতভাবে অনুসরণ করা হয়। চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, ব্যাংক খাতের সংস্কার এবং সাধারণ মানুষের আমানতের সুরক্ষায় এই ধরণের কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়া অপরিহার্য হয়ে পড়েছিল। কর্মকর্তারা আশা করছেন, এর মাধ্যমে ব্যাংকগুলোর আর্থিক ভিত্তি পুনরায় শক্তিশালী হবে।
একীভূত হওয়া পাঁচ ব্যাংকের তালিকা
যে পাঁচটি ব্যাংক এই একীভূতকরণ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে সেগুলো হলো ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক এবং ইউনিয়ন ব্যাংক। এছাড়া এই তালিকায় রয়েছে এক্সিম ব্যাংক এবং সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকও। এই পাঁচটি ব্যাংক একত্রিত হয়ে এখন থেকে "সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক" নামে একটি নতুন আর্থিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে কার্যক্রম পরিচালনা করবে। নতুন এই ব্যাংকটি পুরোনো ব্যাংকগুলোর সকল দায়, সম্পদ এবং জনবল অধিগ্রহণ করার মাধ্যমে নিজের যাত্রা শুরু করছে। একীভূতকরণ প্রক্রিয়া পুরোপুরি সম্পন্ন হওয়ার পরে পুরোনো পাঁচটি ব্যাংক আইনত বিলুপ্ত হয়ে যাবে।
মুনাফা গণনার নতুন সময়সীমা
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, ১ জানুয়ারি ২০২৪ থেকে ২৮ ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত সময়টিকে মুনাফামুক্ত হিসেবে গণ্য করা হবে। এই নির্দিষ্ট সময়ের জন্য আমানতের ওপর কোনো লভ্যাংশ যোগ না করেই চূড়ান্ত স্থিতি নির্ধারণ করতে ব্যাংকগুলোকে বলা হয়েছে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই পুনর্গণনা প্রক্রিয়া শেষ করে রেজুলেশন স্কিমের সফল বাস্তবায়ন নিশ্চিত করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে চিঠিতে। বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, এই দুই বছরের মুনাফা বাদ দেওয়ার ফলেই আমানতের আসল স্থিতি সঠিকভাবে বের করা সম্ভব হবে। আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর আস্থা ফিরিয়ে আনাই এই পদক্ষেপের মূল লক্ষ্য।
আর্থিক কাঠামো ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
নতুন গঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের অনুমোদিত মূলধন নির্ধারণ করা হয়েছে ৪০ হাজার কোটি টাকা। এছাড়া ব্যাংকটির পরিশোধিত মূলধন ৩৫ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করার মাধ্যমে এর মূলধনী ভিত্তি শক্তিশালী করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ব্যাংক রেজুলেশন ডিপার্টমেন্ট এই পুরো প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে যাতে কোনো বিশৃঙ্খলা না ঘটে। ব্যাংক খাতের বর্তমান অস্থিরতা কাটিয়ে উঠতে এই একীভূতকরণ এবং হেয়ারকাট পদ্ধতি একটি মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আমানতকারীরা ভবিষ্যতে নতুন ব্যাংকের মাধ্যমে আরও নিরাপদ ও আধুনিক সেবা পাবেন বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আশ্বস্ত করেছে।