বাংলাদেশের উন্নয়নের প্যারাডক্স: জনাকীর্ণ ঢাকা, বৈষম্য ও সামাজিক অবক্ষয়
বাংলাদেশ এক অপ্রতিরোধ্য গতিতে এগিয়ে চলেছে, কিন্তু এই উন্নয়নের আড়ালে ঘনীভূত হচ্ছে এক গভীর সংকট। জাতিসংঘের তথ্যমতে, ঢাকা এখন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মহানগর, যার জনসংখ্যা ৩ কোটি ৬৬ লাখে পৌঁছেছে। কেন্দ্রীকরণের এই বিষবৃক্ষ মফস্বলের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে সংকুচিত করে মানুষকে প্রতিনিয়ত রাজধানীর দিকে ঠেলে দিচ্ছে, যা বিকেন্দ্রীকরণের স্বপ্নকে ধূলিসাৎ করছে।
অর্থনৈতিক বৈষম্য ও খেলাপি ঋণের বোঝা
উন্নয়নের এই চিত্রে খেলাপি ঋণের পরিমাণ এক বছরে দ্বিগুণ হওয়া এক নেতিবাচক দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে। বিশ্বব্যাংকের মতে, বাংলাদেশে বৈষম্য ভয়ংকর গতিতে বাড়ছে। একদিকে বিলাসবহুল বহুতল দালান নির্মিত হচ্ছে, অন্যদিকে কুড়িল বস্তির মতো হাজার হাজার মানুষ আগুনে পুড়ে বাস্তুচ্যুত হয়ে নগরকেন্দ্রিক দারিদ্র্যের এক অন্তহীন চক্রে আটকে যাচ্ছে।
সামাজিক অবক্ষয়ের চিত্রটি আরও উদ্বেগজনক। কলাবাগানে সম্পত্তি দখলের লোভে স্ত্রীকে হত্যা করে ফ্রিজে লুকিয়ে রাখা কিংবা মোহাম্মদপুরে মা-মেয়েকে পেশাদার কায়দায় হত্যা করা সমাজের নৈতিক ধসের ইঙ্গিত দেয়। অপরাধের ধরনে আসা এই পরিবর্তন এবং শিশুদের প্রতি ক্রমবর্ধমান সহিংসতা প্রমাণ করে যে, অবকাঠামোগত উন্নয়নের সাথে মানবিক সুরক্ষা তাল মেলাতে পারছে না।
সাংস্কৃতিক স্থবিরতা ও স্বাস্থ্য সংকট
কিশোর-কিশোরীদের শারীরিক সক্রিয়তা কমে যাওয়া এবং ওজনাধিক্য নতুন প্রজন্মকে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ফেলছে। ঢাকার একমাত্র শিশুপার্কটি সাত বছর ধরে বন্ধ থাকা শিশুদের সুস্থ বিনোদনের পথ রুদ্ধ করেছে। পাশাপাশি বাউল সংস্কৃতির ওপর আক্রমণ এবং প্রজনন হার বৃদ্ধি ও বাল্যবিবাহের মতো সমস্যাগুলো উন্নয়নশীল বাংলাদেশের এক অন্ধকার দিক উন্মোচন করে।
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত নতুন সরকারের স্লোগান 'সবার আগে বাংলাদেশ'। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপট বলছে, কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নয়, বরং সামাজিক অবক্ষয় রোধ এবং প্রকৃত মানবিক সুরক্ষা নিশ্চিত করাই এখন প্রশাসনের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন না হলে এই উন্নয়ন টেকসই হবে না।