অর্থনীতির হৃদপিণ্ডে রক্তক্ষরণ: বিনিয়োগ স্থবিরতায় খাদের কিনারে বেসরকারি খাত
বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি বেসরকারি খাত বর্তমানে এক ভয়াবহ সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। উচ্চ সুদহার, তীব্র জ্বালানি সংকট এবং ডলারের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবে নতুন বিনিয়োগ কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। গত কয়েক বছরের সামষ্টিক অর্থনীতির অস্থিরতা উদ্যোক্তাদের আস্থা কমিয়ে দিয়েছে, যার ফলে খাদের কিনারে দাঁড়িয়ে আছে দেশের কয়েক হাজার শিল্পপ্রতিষ্ঠান।
সংকটের বিষচক্রে পিষ্ট উদ্যোক্তাদের স্বপ্ন
বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি গত ২২ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে, যা বর্তমানে মাত্র ৬.১ শতাংশ। ঋণের সুদহার ১৬ থেকে ১৭ শতাংশে উন্নীত হওয়ায় ব্যবসায়িক খরচ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে, ফলে নতুন কারখানা স্থাপন বা কর্মসংস্থান তৈরির পথ বন্ধ হয়ে গেছে। উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, এতো চড়া সুদে ঋণ নিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করা এখন আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত হিসেবে গণ্য হচ্ছে।
জ্বালানি সংকট ও ডলারের তীব্র সংকটে শিল্প উৎপাদন ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। ডলারের বিনিময় হার ১২২ টাকার উপরে উঠে যাওয়ায় কাঁচামাল আমদানির ব্যয় আকাশচুম্বী হয়েছে, যা ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের অস্তিত্বের সংকটে ফেলেছে। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতায় সাভার ও চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন এলাকায় কয়েকশ কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে, যার ফলে বিপুল সংখ্যক শ্রমিক বেকার হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছেন।
দেশের মোট জিডিপিতে সিংহভাগ অবদান রাখা এই খাতকে চাঙ্গা করা নতুন সরকারের জন্য একটি বিশাল অগ্নিপরীক্ষা। রেকর্ড পরিমাণ খেলাপি ঋণ এবং ব্যাংকিং খাতের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থার সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। বৈদেশিক বিনিয়োগ বা এফডিআই আশঙ্কাজনক হারে কমে যাওয়ায় অর্থনীতির চাকা সচল রাখা এখন বড় চ্যালেঞ্জ। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং চাঁদাবাজি বন্ধ করা এখন ব্যবসায়ীদের প্রধান দাবি।
অর্থনীতিবিদদের মতে, সুদের হার ও ডলারের বিনিময় হার সহনীয় পর্যায়ে না আনলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানো সম্ভব নয়। শিল্প উৎপাদন সচল রাখতে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং কর প্রশাসনের সংস্কার জরুরি হয়ে পড়েছে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বজায় রাখতে বেসরকারি খাতকে খাদের কিনারা থেকে টেনে তোলা এখন সময়ের দাবি। সরকারের দ্রুত ও কার্যকরী পদক্ষেপই পারে এই স্থবিরতা কাটাতে।