সর্বশেষ
Loading breaking news...

ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদ ও খেলাপি সংস্কৃতিতে বিনিয়োগে 'মরণফাঁদ'

খবরের ছবি
ছবি: সংরক্ষণাগার

দেশের অর্থনীতির প্রাণভোমরা হলো ব্যবসা ও বিনিয়োগ, কিন্তু বর্তমানে সেই পথেই সৃষ্টি হয়েছে পাহাড়প্রমাণ বাধা। ব্যাংকিং খাতের ভয়াবহ খেলাপি ঋণ আর ঋণের উচ্চ সুদের হার এখন বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রধান মরণফাঁদ হিসেবে দাঁড়িয়েছে। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) তাদের সাম্প্রতিক এক পর্যবেক্ষণে এই উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরেছে। সংস্থাটির মতে, খেলাপি ঋণের লাগামহীন বোঝা আর সুদের হার নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা দেশের ব্যবসায়িক পরিবেশকে এক গভীর অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে।

'অভিশপ্ত' খেলাপি ঋণ ও সুদের আগ্নেয়গিরি

ধানমণ্ডিতে সিপিডি কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, গত ১৮০ দিনে দেশের ব্যাংকিং খাতে স্বচ্ছতার অভাব চরম আকার ধারণ করেছে। সরকারি ও বেসরকারি—উভয় খাতের ব্যাংকগুলোতেই বাড়ছে অনাদায়ী ঋণের পাহাড়, যা সরাসরি আঘাত হানছে ব্যাংকের মূলধন সক্ষমতায়। ঝুঁকি এড়াতে ব্যাংকগুলো এখন ঋণ দিতে অনীহা দেখাচ্ছে এবং পাল্লা দিয়ে বাড়াচ্ছে সুদের হার। অনেক ক্ষেত্রে ঋণের সুদ দুই অঙ্কের ঘর ছাড়িয়ে যাওয়ায় নতুন উদ্যোক্তারা পিছু হটতে বাধ্য হচ্ছেন। এমনকি ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের উদ্যোক্তারা ব্যাংকিং সেবা থেকে বঞ্চিত হয়ে উচ্চ সুদে বিভিন্ন অপ্রাতিষ্ঠানিক উৎস থেকে ঋণ নিচ্ছেন, যা তাঁদের ব্যবসাকে চরম ঝুঁকির মুখে ফেলছে।

তদারকির অভাব আর রাজনৈতিক প্রভাবের নেপথ্য কাহিনি

সিপিডির প্রতিবেদনে খেলাপি ঋণের পেছনে সুনির্দিষ্ট কিছু কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। সংস্থাটি বলছে, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল তদারকি এবং আইনি কাঠামোর সীমাবদ্ধতাই আজকের এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী। বড় ঋণগ্রহীতারা কিস্তি শোধ না করেও বারবার নতুন ঋণের সুবিধা পাচ্ছেন, যা ব্যাংকিং খাতের শৃঙ্খলা পুরোপুরি ভেঙে দিয়েছে। এই সংস্কৃতি সৎ ব্যবসায়ীদের নিরুৎসাহিত করছে এবং জনগণের আমানতের নিরাপত্তাকে প্রশ্নের মুখে ফেলছে। সিপিডি মনে করে, কঠোর আইনি ব্যবস্থা এবং বড় ঋণগ্রহীতাদের বিশেষ সুবিধা দেওয়া বন্ধ না করলে এই সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়।

বিতর্কিত চুক্তির আবর্তে দেশের ভবিষ্যৎ

অর্থনৈতিক সংস্কারের পাশাপাশি বৈদেশিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও সতর্কবার্তা দিয়েছে সিপিডি। সংস্থাটির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা বিদায়ী সরকারের অন্তর্বর্তী বাণিজ্য চুক্তিকে 'বৈষম্যমূলক' বলে অভিহিত করেছেন। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, এই চুক্তির ফলে দেশের ওপর মার্কিন পণ্য ও সেবার একতরফা আধিপত্য তৈরি হতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী। একই সঙ্গে জাপানের সাথে হওয়া অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি এবং বিদ্যুৎ খাতের অতিরিক্ত সক্ষমতা চার্জের বোঝা অর্থনীতিকে আরও পঙ্গু করে দিতে পারে বলে তিনি সতর্ক করেন। ব্যাংকিং খাতের আমূল সংস্কার ছাড়া দেশের কোনো অর্থনৈতিক পদক্ষেপই যে টেকসই হবে না, তা আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে এই সংস্থাটি।

সিপিডি আরও সুপারিশ করেছে যে, একটি স্বাধীন ব্যাংক কমিশন গঠন করা জরুরি, যারা রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে কাজ করতে পারবে। এছাড়া ঋণ খেলাপিদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। অন্যথায়, দেশের অর্থনীতি দীর্ঘমেয়াদী মন্দার কবলে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।

আরও পড়ুন