বায়ুদূষণের বৈশ্বিক তালিকায় শীর্ষে কায়রো, শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থানে মেগাসিটি ঢাকা
জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে ধুঁকছে পৃথিবী, আর সেই ক্ষত আরও গভীর করছে বায়ুদূষণ। সোমবার সকালের সূর্য যখন কুয়াশা ভেদ করে উঁকি দিচ্ছিল, তখনই রাজধানী ঢাকার বাতাসের মান পৌঁছে যায় এক বিপজ্জনক স্তরে। আন্তর্জাতিক বায়ুমান প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান আইকিউএয়ারের তথ্য বলছে, মেগাসিটি ঢাকার বাতাস এখন জনস্বাস্থ্যের জন্য এক বড় হুমকির নাম। দূষণের বিষাক্ত চাদরে ঢাকা এই নগরী এখন বিশ্বের অন্যতম অস্বাস্থ্যকর স্থান হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
দূষণের বিশ্বমঞ্চে ঢাকার অবস্থান
সোমবার সকাল সাড়ে ১০টায় আইকিউএয়ারের সূচকে ঢাকার স্কোর ছিল ২৮৫, যা এই শহরকে বিশ্বের দূষিত শহরের তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে তুলে এনেছে। ৩০০ স্কোর নিয়ে তালিকার শীর্ষে রয়েছে মিশরের কায়রো। প্রতিবেশী দেশ ভারতের দিল্লি ২৫৩ স্কোর নিয়ে তৃতীয় এবং চীনের চেংদু ২৪৪ স্কোর নিয়ে চতুর্থ স্থানে রয়েছে। "পরিবেশবিদরা ঢাকার এই ২৮৫ স্কোরকে ‘খুবই অস্বাস্থ্যকর’ হিসেবে অভিহিত করেছেন, যা নগরবাসীর জন্য এক বড় অশনি সংকেত।"
নীরব ঘাতক ও স্বাস্থ্যঝুঁকি
আইকিউএয়ারের মানদণ্ড অনুযায়ী, একিউআই স্কোর ২০১ থেকে ৩০০-এর মধ্যে থাকলে তাকে ‘খুবই অস্বাস্থ্যকর’ বলা হয়, আর ৩০১ ছাড়ালে তা হয় ‘দুর্যোগপূর্ণ’। ঢাকার বর্তমান পরিস্থিতি সেই দুর্যোগপূর্ণ অবস্থার খুব কাছাকাছি। বায়ুদূষণের এই নীরব ঘাতক শিশু, প্রবীণ এবং অসুস্থ ব্যক্তিদের জন্য জীবনঝুঁকি তৈরি করছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মতে, দূষিত বাতাসের কারণে স্ট্রোক, হৃদরোগ ও ফুসফুসের ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে প্রতি বছর বিশ্বে প্রায় ৭০ লাখ মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে।
বিষাক্ত নিঃশ্বাসের নেপথ্য কারণ
ঢাকার বাতাস কেন দিন দিন এমন প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে? ২০১৯ সালের পরিবেশ অধিদপ্তর ও বিশ্বব্যাংকের যৌথ প্রতিবেদনে এর প্রধান তিনটি উৎস চিহ্নিত করা হয়েছিল। শহরের চারপাশে যত্রতত্র গড়ে ওঠা ইটভাটা, ফিটনেসবিহীন যানবাহনের কালো ধোঁয়া এবং অপরিকল্পিত নির্মাণকাজের ধুলাই এর মূল কারণ। বাতাসে ভেসে বেড়ানো বস্তুকণা (পিএম১০ ও পিএম২.৫), নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইড এবং কার্বন মনোক্সাইডের মতো বিষাক্ত উপাদান প্রতিটি নিঃশ্বাসকে করে তুলেছে ঝুঁকিপূর্ণ।
বাঁচার উপায় ও করণীয়
পরিবেশবিজ্ঞানীরা বলছেন, এই বিষাক্ত বলয় থেকে মুক্তি পেতে এখনই দীর্ঘমেয়াদি ও পরিকল্পিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। কেবল আইন প্রণয়ন নয়, বরং তার কঠোর বাস্তবায়নই পারে এই শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি থেকে নগরবাসীকে স্বস্তি দিতে। অন্যথায়, এই নীরব ঘাতকের ছোবল থেকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে। "নাগরিক সচেতনতা এবং সরকারি উদ্যোগের সমন্বয়েই কেবল ঢাকাকে বসবাসের যোগ্য করে তোলা সম্ভব।"