বজ্রপাতের সময় গাছের মাথায় একপ্রকার ক্ষীণ নীল আলোর ঝলক দেখা যায়—এই ধারণা বিজ্ঞান মহলে প্রচলিত ছিল প্রায় একশো বছর ধরে। তবে এতদিন এই দৃশ্যের কোনো প্রত্যক্ষ প্রমাণ মেলেনি। অবশেষে সেই রহস্যের জট খুলল। যুক্তরাষ্ট্রের পেন স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক প্রথমবারের মতো সক্রিয় ঝড়ের সময় গাছের চূড়ায় সেই অতি-ক্ষীণ নীল বিদ্যুতের ঝলক সফলভাবে ক্যামেরাবন্দী করতে সক্ষম হয়েছেন। এই যুগান্তকারী আবিষ্কার বিজ্ঞান জগতে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।
বিজ্ঞানীদের চোখে ‘করোনা ডিসচার্জ’
বিজ্ঞানীরা এই অতি-দুর্বল স্ফুলিঙ্গকে ‘করোনা’ বা ‘করোনা ডিসচার্জ’ নামে অভিহিত করেন। এই যুগান্তকারী গবেষণাটি সম্প্রতি আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সাময়িকী ‘জিওফিজিক্যাল রিসার্চ লেটার্স’-এ প্রকাশিত হয়েছে, যা আবহাওয়াবিদ্যা এবং বায়ুমণ্ডলীয় পদার্থবিজ্ঞানের জগতে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। এটি কেবল একটি দৃশ্যমান প্রমাণ নয়, বরং বায়ুমণ্ডলের বৈদ্যুতিক প্রক্রিয়া বোঝার ক্ষেত্রেও একটি বড় অগ্রগতি।
লুকানো রহস্যের জট খুলল যেভাবে: গবেষণা পদ্ধতি
গবেষণার নেতৃত্বে থাকা প্যাট্রিক ম্যাকফারল্যান্ড এবং তাঁর দল এই অত্যাশ্চর্য ঘটনাটি পর্যবেক্ষণের জন্য এক অভিনব পদ্ধতি অবলম্বন করেন। তাঁরা একটি সাধারণ টয়োটা সিয়েনা গাড়িটিকে চলমান গবেষণাগারে রূপান্তরিত করেন। এই বিশেষ গাড়িতে অত্যাধুনিক আবহাওয়া পরিমাপক যন্ত্র, বৈদ্যুতিক ক্ষেত্র নির্ণায়ক (ইলেকট্রিক ফিল্ড ডিটেক্টর), লেজার প্রযুক্তি এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—অতিবেগুনি রশ্মি শনাক্তকরণে সক্ষম বিশেষ ক্যামেরা সংযুক্ত করা হয়। গবেষকরা জানতেন যে এই করোনা ঝলক খালি চোখে দৃশ্যমান নয়, তাই বিশেষ প্রযুক্তির সাহায্য নেওয়া অপরিহার্য ছিল।
প্রথম সফল ক্যামেরাবন্দী: পেমব্রোকের ঘটনা
২০২৪ সালের গ্রীষ্মকালে গবেষকদের দলটি ফ্লোরিডা থেকে পেনসিলভানিয়া পর্যন্ত একাধিক শক্তিশালী ঝড়ের পথ অনুসরণ করে। চূড়ান্ত সাফল্য আসে নর্থ ক্যারোলাইনার পেমব্রোক শহরে। সেখানে একটি সুইটগাম গাছের একেবারে চূড়ার দিকে ক্যামেরা তাক করে রাখার ৯০ মিনিটের মধ্যেই তারা মোট ৪১টি করোনা ঝলক নথিভুক্ত করতে সক্ষম হন। প্রতিটি ঝলক সর্বোচ্চ তিন সেকেন্ডের জন্য স্থায়ী ছিল এবং একটি পাতা থেকে অন্য পাতায় দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছিল। একইসঙ্গে, কাছাকাছি থাকা অন্যান্য গাছেও অনুরূপ দৃশ্য পরিলক্ষিত হয়, যা এই ঘটনার পুনরাবৃত্তিমূলক প্রকৃতি নির্দেশ করে।
বৈজ্ঞানিক তাৎপর্য ও পরিবেশগত প্রভাব
বিজ্ঞানীদের মতে, শক্তিশালী ঝড়ের মেঘে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ সঞ্চিত থাকে, যা মাটির ওপর বিপরীত চার্জ তৈরি করে। এই সঞ্চিত চার্জ যখন গাছের মতো উঁচু কাঠামোর ডগা স্পর্শ করে, তখন তা বায়ুমণ্ডলে অত্যন্ত ক্ষীণ স্ফুলিঙ্গ রূপে নির্গত হয়। পূর্ববর্তী গবেষণায় দেখা গেছে, এই করোনা কণাগুলি ‘হাইড্রক্সিল র্যাডিক্যাল’ নামক রাসায়নিক পদার্থ তৈরি করে, যা মিথেন গ্যাসের মতো ক্ষতিকর গ্রিনহাউস গ্যাস কমাতে বা ওজোন ও বায়ুদূষণকারী পদার্থ সৃষ্টিতেও ভূমিকা রাখে। এই প্রক্রিয়া গাছের বৃদ্ধি ও বিবর্তনে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে থাকতে পারে বলে বিজ্ঞানীরা অনুমান করছেন।