সর্বশেষ
Loading breaking news...

শুল্ক বাধা ডিঙিয়ে ১.২ ট্রিলিয়ন ডলার বাণিজ্য উদ্বৃত্তের নতুন ইতিহাস গড়ল চীন

খবরের ছবি
ছবি: সংরক্ষণাগার

বিশ্ব অর্থনীতিতে এক অভাবনীয় চমক দেখিয়ে ২০২৫ সালে প্রায় ১.২ ট্রিলিয়ন ডলারের রেকর্ড বাণিজ্য উদ্বৃত্ত অর্জন করেছে চীন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কঠোর শুল্কনীতি এবং ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেই বেইজিং এই বিশাল সাফল্যের ইতিহাস গড়েছে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দীর্ঘদিনের বাণিজ্যিক স্নায়ুযুদ্ধ সত্ত্বেও চীনের এই অগ্রগতি বিশ্ব বাণিজ্যের সমীকরণে এক নতুন মেরুকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। বেইজিংয়ের এই বিশাল উদ্বৃত্তের পাহাড় প্রমাণ করছে যে দেশটি মার্কিন বাজার নির্ভরতা কাটিয়ে বিশ্বজুড়ে নিজেদের প্রভাব সুসংহত করেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, চীনের এই অর্জন কার্যত ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্ক-হুমকিকে "ফুৎকারে উড়িয়ে দেওয়া" ছাড়া আর কিছুই নয়।

কৌশলী চালে বাজার বহুমুখীকরণ

যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের ওপর অতিনির্ভরতা কমিয়ে চীন অত্যন্ত সুচতুরভাবে বিকল্প বাজারগুলোতে নিজেদের শিকড় শক্ত করেছে। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, গত এক বছরে যুক্তরাষ্ট্রে চীনের রফতানি ২০ শতাংশ কমলেও আফ্রিকায় রফতানি বেড়েছে ২৫.৮ শতাংশ। এছাড়া আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোতে রফতানি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৩.৪ শতাংশ, যা মার্কিন শুল্ক বাধার নেতিবাচক প্রভাবকে অনেকাংশে ম্লান করে দিয়েছে। বেইজিংয়ের এই সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনাই তাদের বৈশ্বিক রফতানি বাণিজ্যকে সচল রাখতে মূল ভূমিকা পালন করেছে। মূলত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও লাতিন আমেরিকার মতো উদীয়মান বাজারগুলো এখন চীনের বাণিজ্যের প্রধান হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।

অর্থনৈতিক পূর্বাভাসে বড় চমক

অর্থনীতিবিদদের যাবতীয় পূর্বাভাস ভুল প্রমাণ করে গত ডিসেম্বরে চীনের রফতানি বেড়েছে ৬.৬ শতাংশ, যেখানে প্রত্যাশা ছিল মাত্র ৩ শতাংশের। পিনপয়েন্ট অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের প্রধান অর্থনীতিবিদ ঝিওয়েই ঝাং মনে করেন, এই শক্তিশালী রফতানি প্রবৃদ্ধিই চীনের অভ্যন্তরীণ চাহিদার ঘাটতি পূরণ করতে সক্ষম হচ্ছে। অন্যদিকে চীনের কাস্টমস প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বাণিজ্যিক অংশীদারদের বহুমুখীকরণের ফলেই চীন আজ যেকোনো বৈশ্বিক ঝুঁকি মোকাবেলায় সক্ষম। এমনকি ইউরোপীয় ইউনিয়নেও বেইজিংয়ের রফতানি বেড়েছে ৮.৪ শতাংশ, যা তাদের কৌশলী অবস্থানেরই জোরালো প্রমাণ। এর ফলে বৈশ্বিক মন্দার আশঙ্কার মধ্যেও চীনের কলকারখানাগুলো নিজেদের পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদনে ফিরতে পেরেছে।

আগামীর চ্যালেঞ্জ ও শঙ্কা

বর্তমান সাফল্যের আনন্দ ২০২৬ সালেও বজায় থাকবে কি না, তা নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে কিছুটা সংশয় থেকেই যাচ্ছে। ইরান ইস্যুতে ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি চীনের ওপর নতুন করে ২৫ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছেন। এই হুমকি দুই পরাশক্তির মধ্যে নতুন করে বাণিজ্যিক উত্তেজনা তৈরির স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন ক্যাপিটাল ইকোনমিকসের বিশেষজ্ঞরা। ভূ-রাজনৈতিক এই অস্থিরতা বিশ্ববাজারে তেলের দাম এবং সরবরাহের ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, ট্রাম্পের এই নতুন চাপ মোকাবেলা করে বেইজিং তাদের সাফল্যের ধারা কতটা স্থায়ী করতে পারে।

বিশ্ব অর্থনীতিতে নয়া দাপট

বৈশ্বিক রাজনীতির এই জটিল দাবার চালে বেইজিং বর্তমানে অত্যন্ত সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা। প্রায় ১ লাখ ১৮ হাজার ৯০০ কোটি ডলারের উদ্বৃত্ত চীনের শিল্প উৎপাদন ও রফতানি সক্ষমতার এক অভূতপূর্ব নজির হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। পশ্চিমা দেশগুলোর চাপ এড়াতে চীন এখন গ্লোবাল সাউথ বা দক্ষিণ গোলার্ধের দেশগুলোর সাথে দীর্ঘমেয়াদী বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদার করছে। আগামী দিনে আন্তর্জাতিক বাজারে নিজেদের একক আধিপত্য বজায় রাখতে চীন আরও আক্রমণাত্মক কৌশল গ্রহণ করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আপাতত চীনের এই "উদ্বৃত্তের পাহাড়" বৈশ্বিক অর্থনীতিতে তাদের অপরিহার্যতাই পুনরায় প্রমাণ করল।

আরও পড়ুন