নির্বাচন ঘিরে গুজবের বন্যা রুখতে জাতিসংঘের জরুরি সহায়তা চাইলেন ড. ইউনূস
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে এক উদ্বেগজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। চারদিকে ছড়িয়ে পড়া ভুয়া তথ্য ও বিভ্রান্তির জাল ছিঁড়তে এবার আন্তর্জাতিক মহলের দ্বারস্থ হলেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। মঙ্গলবার জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার তুর্কের সঙ্গে এক গুরুত্বপূর্ণ ফোনালাপে তিনি এই সংকট মোকাবিলায় সরাসরি সহায়তা কামনা করেন। নির্বাচনের ঠিক আগমুহূর্তে অপপ্রচারের এই স্রোত ঠেকাতে জাতিসংঘের হস্তক্ষেপ চাওয়ার বিষয়টি রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
গুজবের অপকৌশল ও আন্তর্জাতিক সংযোগ
প্রধান উপদেষ্টা আলোচনার শুরুতেই স্পষ্ট করেন যে, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বর্তমানে ভুয়া তথ্যের যেন এক ‘বন্যা’ বয়ে যাচ্ছে। কেবল দেশের অভ্যন্তরের স্থানীয় সূত্র নয়, বিদেশি গণমাধ্যম থেকেও উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মিথ্যা সংবাদ ছড়ানোর অভিযোগ তোলেন তিনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই অপপ্রচারের ভয়াবহতা তুলে ধরে ড. ইউনূস জানান, সরকার আশঙ্কা করছে—এই গুজবের স্রোত সুষ্ঠু নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। প্রত্যুত্তরে ভলকার তুর্ক জানান, বিষয়টি ইতিমধ্যেই তার নজরে এসেছে। তিনি আশ্বাস দেন, ভুয়া তথ্যের এই ক্রমবর্ধমান চ্যালেঞ্জ ও ‘তথ্য সন্ত্রাস’ মোকাবিলায় জাতিসংঘের মানবাধিকার কার্যালয় বাংলাদেশের পাশে ঢাল হয়ে দাঁড়াবে। তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলেন, ‘ভুয়া তথ্যের পরিমাণ পাহাড়সম। তবে এ সমস্যা মোকাবিলায় যা যা করা প্রয়োজন, আমরা তার সবটুকুই করব।’
সংস্কারের অগ্নিপরীক্ষা ও গুমের ইতিবৃত্ত
কেবল নির্বাচনী গুজবই নয়, আলোচনায় উঠে আসে আরও গভীর কিছু রাষ্ট্রীয় ক্ষত। ফোনালাপে দুই পক্ষ আসন্ন গণভোট, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং গুম সংক্রান্ত কমিশনের স্পর্শকাতর কার্যক্রম নিয়ে বিশদ মতবিনিময় করেন। ভলকার তুর্ক গুমের ঘটনার তদন্ত ও মানবাধিকার রক্ষার স্বার্থে একটি সত্যিকার অর্থে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (এনএইচআরসি) গঠনের ওপর জোর দেন। জবাবে ড. ইউনূস আশ্বস্ত করেন যে, এ সংক্রান্ত অধ্যাদেশ ইতিমধ্যেই জারি করা হয়েছে এবং ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের আগেই নতুন কমিশন পুনর্গঠন করা হবে। তিনি দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে বলেন, ‘আমরা দায়িত্ব ছাড়ার আগেই এটি নিশ্চিত করে যাব।’
ন্যায়বিচার ও প্রশংসা
এছাড়া, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বিগত শাসনামলে গুমের শিকার হওয়া ব্যক্তিদের ন্যায়বিচার নিশ্চিতে গুম কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদন জাতিসংঘের মানবাধিকার হাইকমিশনারের কাছে হস্তান্তর করেছেন প্রধান উপদেষ্টা। ভলকার তুর্ক গত দেড় বছরে ড. ইউনূসের নেওয়া সাহসী পদক্ষেপগুলোর ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং ভবিষ্যতেও বাংলাদেশের পাশে থাকার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। এই আলোচনা নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। জাতিসংঘের সমর্থন বাংলাদেশের নির্বাচনী সুষ্ঠুতা বজায় রাখার প্রচেষ্টাকে আরও শক্তিশালী করবে।
অব্যাহত অংশীদারিত্ব ও সমর্থন
বাংলাদেশের নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতার এই অনুরোধ একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় নির্দেশ করে, যেখানে গণতান্ত্রিক অখণ্ডতা রক্ষার জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তা চাওয়া হচ্ছে। অপতথ্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে জাতিসংঘের সহায়তা একটি বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত চ্যালেঞ্জকে তুলে ধরে। এই আলোচনা মানবাধিকার এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা উন্নয়নে প্রতিশ্রুতির পুনর্নিশ্চিতকরণও করেছে। ড. ইউনূসের এই সক্রিয় অংশগ্রহণ একটি স্বচ্ছ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করার এবং প্রচারণার নেতিবাচক প্রভাব প্রশমিত করার অঙ্গীকার প্রদর্শন করে। জাতিসংঘের কাছ থেকে প্রাপ্ত আশ্বাস একটি স্থিতিশীল নির্বাচনী পরিবেশ নিশ্চিত করার দিকে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ।