সর্বশেষ
Loading breaking news...

কাগজে মজুতের পাহাড়, বাজারে কৃত্রিম হাহাকার: সারের সিন্ডিকেটে পিষ্ট কৃষক, ঝুঁকিতে খাদ্য নিরাপত্তা

খবরের ছবি
ছবি: সংরক্ষণাগার

খুলনার কয়রার গাতিঘেরি গ্রামের কৃষক দেবাশীষ মণ্ডলের কপালে এখন দুশ্চিন্তার ভাঁজ। আট বিঘা জমিতে বোরো ধান চাষ করলেও লাভের বদলে এখন লোকসানের শঙ্কায় দিন কাটছে তাঁর। মৌসুমের শুরুতে নির্ধারিত মূল্যে সার পেলেও এখন কেজিপ্রতি ৩ থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি দাম দিতে হচ্ছে। শুধু দেবাশীষ নন, ভরা বোরো মৌসুমে সারের বাজারের এমন অরাজকতায় দেশের লাখ লাখ কৃষক আজ দিশেহারা। একদিকে বাড়ছে সেচ ও শ্রমিকের মজুরি, অন্যদিকে সারের কৃত্রিম সংকটে উৎপাদন খরচ আকাশচুম্বী হয়ে ওঠায় হুমকির মুখে পড়ছে জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা।

গুদাম ভরা সারের স্তূপ, তবুও মাঠপর্যায়ে দামের আগুন

সরকারি পরিসংখ্যানে দেশে সারের কোনো ঘাটতি নেই। বিএডিসি জানাচ্ছে, তাদের গুদামে সার রাখার জায়গা পর্যন্ত মিলছে না। অথচ মাঠের চিত্র সম্পূর্ণ বিপরীত। সরকার নির্ধারিত এক বস্তা ইউরিয়া সারের দাম ১ হাজার ২৫০ টাকা হলেও কৃষকদের গুনতে হচ্ছে ১ হাজার ৪৬০ টাকা পর্যন্ত। ডিএপি ও টিএসপির ক্ষেত্রেও একই কারসাজি চলছে, যেখানে বস্তাপ্রতি বাড়তি নেওয়া হচ্ছে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা। কৃষকদের অভিযোগ, ডিলার ও খুচরা বিক্রেতাদের একটি চক্র পরিকল্পিতভাবে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে তাঁদের পকেট কাটছে। যথাযথ নজরদারির অভাবেই এই সিন্ডিকেট দিন দিন বেপরোয়া হয়ে উঠছে।

সিন্ডিকেটের মরণকামড়: ১১ জেলায় কৃষকের দীর্ঘশ্বাস

সারা দেশের ১১টি জেলায় অনুসন্ধান চালিয়ে দেখা গেছে, সারের বাজার এখন মুষ্টিমেয় কিছু প্রভাবশালী ডিলার পরিবারের নিয়ন্ত্রণে। চুয়াডাঙ্গায় একই পরিবারের একাধিক সদস্যের নামে ডিলারশিপ নিয়ে বাজার নিয়ন্ত্রণের চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে। কোথাও কোথাও রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে সার মজুত করা হচ্ছে। গাইবান্ধা ও দিনাজপুরের কৃষকরা জানাচ্ছেন, রসিদ চাইলে তাঁদের সার দেওয়া হচ্ছে না। নাটোরে রাজনৈতিক নেতার বাড়ি থেকে উদ্ধার হচ্ছে শত শত বস্তা সার। সারের এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির ফলে প্রতি বিঘা জমিতে বোরো চাষের খরচ প্রায় ৩৫ হাজার টাকায় গিয়ে ঠেকেছে, যার বিপরীতে লাভের অঙ্ক এখন শূন্যের কাছাকাছি।

নীতিমালার ফাঁকফোকর ও খাদ্য নিরাপত্তায় অশনিসংকেত

কৃষি অর্থনীতিবিদদের মতে, বোরো মৌসুমই দেশের চালের প্রধান যোগানদাতা। এই সময়ে সারের বাজারের অস্থিরতা বজায় থাকলে ফলনে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে, যার চূড়ান্ত ধাক্কা লাগবে চালের বাজারে। সার ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা আনতে ২০০৯ সালের নীতিমালা সংশোধন করা হলেও পুরোনো সিন্ডিকেট এখনো সক্রিয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কাগজে-কলমে সারের মজুত কত আছে, তার চেয়ে জরুরি হলো মাঠপর্যায়ে কৃষক সঠিক দামে সার পাচ্ছেন কি না তা নিশ্চিত করা। কৃষি প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, সারের দাম নিয়ে কারসাজি করলে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে মাঠের বাস্তব পরিস্থিতি বদলাতে সমন্বিত তদারকির কোনো বিকল্প নেই।

আরও পড়ুন