লন্ডনের ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানে ৯৩০ মিলিয়ন পাউন্ড জালিয়াতি ও ঘাটতি: সাবেক ভূমিমন্ত্রীর ‘গুপ্ত সাম্রাজ্য’ নড়বড়ে
বাংলাদেশের সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীর বিশাল সম্পত্তি সাম্রাজ্যের নেপথ্যে থাকা অন্যতম অর্থদাতা প্রতিষ্ঠান ‘মার্কেট ফাইন্যান্সিয়াল সলিউশনস’ (এমএফএস) এখন বড় ধরনের জালিয়াতির অভিযোগে দেউলিয়া হওয়ার পথে। লন্ডনের এই বিতর্কিত ‘ছায়া ব্যাংক’ বা অর্থলগ্নিকারী প্রতিষ্ঠানটিকে বর্তমানে প্রশাসনিক তত্ত্বাবধানে নেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে একই সম্পদের বিপরীতে একাধিকবার ঋণ নেওয়ার মতো গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে, যা বৈশ্বিক অর্থপ্রবাহের স্বচ্ছতা ও নিয়ন্ত্রণকাঠামোকে বড় ধরনের বিতর্কের মুখে ঠেলে দিয়েছে। এই ঘটনার মধ্য দিয়ে সাবেক মন্ত্রীর শতকোটি পাউন্ডের আর্থিক সাম্রাজ্যের অস্বচ্ছতা নতুন করে জনসমক্ষে এসেছে।
ছায়া ব্যাংকিংয়ের আড়ালে বিশাল অর্থ লোপাট
যুক্তরাজ্যের আদালতের নথিতে দেখা গেছে, এমএফএস-এর স্থিতিপত্রে বর্তমানে ৯৩ কোটি পাউন্ড বা প্রায় ৯৩০ মিলিয়ন পাউন্ডের বিশাল ঘাটতি রয়েছে। ২০০৬ সালে পরেশ রাজা ও তার স্ত্রী টিবা এই প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তুলেছিলেন। তারা মূলত ‘বাই-টু-লেট’ মর্টগেজ এবং ব্রিজিং লোনের মতো জটিল ও সম্পত্তিভিত্তিক স্বল্পমেয়াদী ঋণ প্রদান করত। জালিয়াতির অভিযোগ এতটাই গুরুতর যে, বিচারক ব্রিগস প্রতিষ্ঠানটিকে প্রশাসনিক তত্ত্বাবধানে নেওয়ার আদেশ দিয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, একই সম্পত্তির বিপরীতে বারবার ঋণ নেওয়ার ফলে ১২০ কোটি পাউন্ড ঋণের প্রায় ৮০ শতাংশই এখন হিসাবের বাইরে চলে গেছে। এই বিশাল অর্থ জালিয়াতির ঘটনায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিশ্বাসযোগ্যতা এখন খাদের কিনারায়।
সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী ২০১৯ সালে দায়িত্ব নেওয়ার পর যুক্তরাজ্যে তার সাম্রাজ্য ব্যাপকভাবে বিস্তার করেন। অভিযোগ রয়েছে, এমএফএস-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে শত শত সুরক্ষিত ঋণ নিয়ে তিনি তার এই বিশাল পোর্টফোলিও গড়ে তুলেছিলেন। লন্ডনের অভিজাত এলাকায় তার নামে একাধিক বিলাসবহুল প্রপার্টি রয়েছে বলে অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে। এমএফএস-এর পতন তার এই সাম্রাজ্যের ভীত নড়বড়ে করে দিয়েছে, কারণ ঋণের উৎস বন্ধ হলে সম্পত্তি ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।
লন্ডন থেকে ঢাকা: তদন্তের বেড়াজাল
২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর এই ছায়া ব্যাংকিংয়ের সব লেনদেন তদন্তের আওতায় আসে। বর্তমানে যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল ক্রাইম এজেন্সি (এনসিএ) সাবেক মন্ত্রীর ১৭ কোটি পাউন্ড মূল্যের সম্পত্তি জব্দ ও তদন্ত করছে। শুধু তাই নয়, দুর্নীতির এই ছায়া আন্তর্জাতিক মহলেও পৌঁছেছে; যার ফলে ব্রিটিশ ট্রেজারি মন্ত্রীর পদ থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন টিউলিপ সিদ্দিক। বাংলাদেশ সরকারও এখন এই প্রভাবশালী মহলের পাচারকৃত অর্থ ও অবৈধ সম্পদের উৎস সন্ধানে তৎপরতা শুরু করেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিট (বিএফআইইউ) ইতোমধ্যে সাইফুজ্জামান চৌধুরী এবং তার পরিবারের ব্যাংক হিসাব তলব করেছে। বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনতে আন্তর্জাতিক আইনি সহায়তার কথাও ভাবছে অন্তর্বর্তী সরকার। এমএফএস-এর কেলেঙ্কারি উন্মোচিত হওয়ার ফলে বাংলাদেশের দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের পালে নতুন হাওয়া লেগেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।