গাজা দখলের 'মাস্টারপ্ল্যান' ফাঁস ইসরায়েলের অংশ করার দাবিতে নেসেটে ঝড়
যুদ্ধবিরতি চুক্তি কাগজে-কলমে কার্যকর থাকলেও গাজায় ইসরায়েলের লাগাতার হামলায় তার ভঙ্গুরতা বারবার স্পষ্ট হচ্ছে। এই তীব্র সংকটের মধ্যে এসে এবার গাজা উপত্যকাকে স্থায়ীভাবে নিজেদের ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করার পক্ষে প্রকাশ্য অবস্থান নিলেন ইসরায়েলের শীর্ষ রাজনীতিবিদ ও আইনপ্রণেতারা। এই পদক্ষেপ কার্যত যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত সেই পরিকল্পনাকে অগ্রাহ্য করছে, যেখানে গাজায় ইসরায়েলের কোনো সামরিক উপস্থিতি বা ভূখণ্ডগত দখল স্পষ্টতই নাকচ করা হয়েছিল। উপত্যকা দখলের এই নতুন দাবিতে আন্তর্জাতিক মহলে উত্তেজনা বাড়ছে।
নেসেটে ক্ষমতার দাবি
ইসরায়েলি পার্লামেন্ট নেসেটে ‘গাজা—দ্য ডে আফটার’ শীর্ষক এক গুরুত্বপূর্ণ সম্মেলনে গত সোমবার এসব বিস্ফোরক বক্তব্য আসে। ইসরায়েলের ডানপন্থী চ্যানেল ৭-এর প্রতিবেদনের বরাতে খবরটি প্রকাশিত হয়। সম্মেলনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে ইসরায়েলের উপপ্রধানমন্ত্রী ইয়ারিভ লেভিন জোর দিয়ে বলেন, গাজায় নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা ইসরায়েলের বৃহত্তর ভূখণ্ডগত দাবির অবিচ্ছেদ্য অংশ। তিনি ঘোষণা করেন, “আমাদের গাজায় এবং পুরো ‘ল্যান্ড অব ইসরায়েল’-জুড়ে নিয়ন্ত্রণ থাকতে হবে। এটি, প্রথম ও প্রধানত, আমাদের দেশ।” উপপ্রধানমন্ত্রীর সুরেই কট্টর ডানপন্থী আইনপ্রণেতা সিমচা রথম্যানও মত দেন, গাজার ওপর পূর্ণ কর্তৃত্ব ইসরায়েলের হাতেই থাকা উচিত।
মানবতার করুণ চিত্র
এদিকে, গাজায় ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের মানবিক মূল্য ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। প্রতিবেদনে জানানো হয়, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে চালানো এই অভিযানে এ পর্যন্ত ৭১ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন, যাদের অধিকাংশই নারী ও শিশু। আহত হয়েছেন আরো ১ লাখ ৭১ হাজারের বেশি মানুষ। এই সময়ে গাজা উপত্যকা কার্যত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। ১০ অক্টোবর একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও, গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, যুদ্ধবিরতির পরেও কমপক্ষে ৪৪২ জন ফিলিস্তিনি নিহত এবং ১,২৩৬ জন আহত হয়েছেন।
হামাসের প্রশাসনিক মোড়
এমন পরিস্থিতিতে গাজার রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ভবিষ্যতের ক্ষেত্রে একটি বড় মোড় দেখা দিয়েছে। হামাসের মুখপাত্র হাজেম কাসেম ট্রাম্পের প্রস্তাবিত 'বোর্ড অব পিস' গঠনের প্রসঙ্গ টেনে ঘোষণা করেছেন যে, শান্তিচুক্তির ভিত্তিতে সব সরকারি প্রতিষ্ঠান ও সংস্থাকে স্বাধীন ফিলিস্তিনি টেকনোক্র্যাট কমিটির কাছে সব ধরনের কর্তৃত্ব হস্তান্তরের জন্য প্রস্তুত থাকতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এটি গাজার প্রশাসনিক কাঠামোতে সম্ভাব্য বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।
যুদ্ধের অবসানের লক্ষ্য
হাজেম কাসেম নিশ্চিত করেছেন যে, জাতীয় স্বার্থ এবং গাজা উপত্যকায় চলমান যুদ্ধের অবসান ঘটানোর পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর উদ্দেশ্য, সম্ভাব্য ফিলিস্তিনি প্রশাসন কার্যক্রম সফলভাবে এগিয়ে নিতে পারে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই ঘোষণাকে গাজার প্রশাসনিক ভবিষ্যতের ক্ষেত্রে একটি বড় বাঁকবদল হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই পদক্ষেপ যুদ্ধক্লান্ত গাজাবাসীর জন্য নতুন এক বাস্তবতার ইঙ্গিত দিতে পারে, যা শান্তি প্রতিষ্ঠার পথ সুগম করতে পারে।