বিদ্বেষ: এক মানসিক ব্যাধি যা সত্যকে অস্বীকার করতে বাধ্য করে
বিদ্বেষ মানুষের মনের এক ভয়ংকর ব্যাধি, যা সত্যকে চোখের সামনে থেকে অদৃশ্য করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। এটি এমন এক অদৃশ্য পর্দা তৈরি করে, যার কারণে স্পষ্ট সত্যও মিথ্যা বলে মনে হয়। যার প্রতি বিদ্বেষ জন্মে, তার হাজারো গুণ থাকা সত্ত্বেও তা চোখে পড়ে না। উল্টে তাকে প্রত্যাখ্যান করা বা কষ্ট দেওয়াই যেন স্বাভাবিক হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু এটি শুধু নৈতিক অবক্ষয় নয়, এর পেছনে রয়েছে চমকপ্রদ মনস্তাত্ত্বিক এবং ধর্মীয় ব্যাখ্যা।
ইতিহাসের পাতায় বিদ্বেষের কালো ছায়া
ধর্মীয় গ্রন্থ অনুযায়ী, বিদ্বেষ সত্য অনুসন্ধানের পথে সবচেয়ে বড় বাধা। পবিত্র কোরআনের বিভিন্ন বর্ণনায় এর প্রমাণ মেলে। ইতিহাসে দেখা যায়, মহানবী (সা.)-এর সততা, আমানতদারি ও চারিত্রিক গুণাবলী সম্পর্কে অবগত থাকা সত্ত্বেও শুধুমাত্র বিদ্বেষের কারণে তৎকালীন কাফির ও মুনাফিকরা তাঁকে সত্য নবী হিসেবে মেনে নেয়নি। তারা তাঁর বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদ দিয়েছে এবং সামাজিক বয়কট করেছে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তারা অন্যায় ও ঔদ্ধত্যভরে নিদর্শনগুলোকে প্রত্যাখ্যান করল, যদিও তাদের অন্তর এগুলোকে সত্য বলে বিশ্বাস করেছিল।’ (সুরা নামল, আয়াত: ১৪)।
বিদ্বেষের কারণে সত্যকে প্রত্যাখ্যান করার এই প্রবণতা আধুনিক মনোবিজ্ঞানেও স্বীকৃত। বিজ্ঞানীরা একে ‘কনফারমেশন বায়াস’ (Confirmation Bias) বা সমর্থন পক্ষপাতিত্ব হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এটি মানুষের চিন্তাধারার একটি সাধারণ ত্রুটি, যেখানে একজন ব্যক্তি নিজের পূর্বপ্রতিষ্ঠিত বিশ্বাস বা ধারণার সপক্ষের তথ্যগুলোকে সহজে গ্রহণ করে এবং গুরুত্ব দেয়। অন্যদিকে, তার বিশ্বাসের বিপরীত কোনো শক্তিশালী প্রমাণ পেলেও সেটিকে সে এড়িয়ে যায় বা ভুল প্রমাণের চেষ্টা করে।
ফলে বিদ্বেষপ্রবণ একজন ব্যক্তি যার প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে, তার সম্পর্কে কোনো ইতিবাচক সত্য গ্রহণ করতে পারে না। তার মস্তিষ্ক কেবল নেতিবাচক তথ্যগুলোকেই খুঁজে বেড়ায়, যা তার বিদ্বেষকে আরও শক্তিশালী করে তোলে। এই মানসিক অবস্থার কারণে ব্যক্তিগত সম্পর্কের পাশাপাশি সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়েও অস্থিরতা সৃষ্টি হয়। সত্যকে মেনে নেওয়ার মানসিক শক্তি হারিয়ে ফেলে মানুষ অন্ধ আবেগের দাস হয়ে পড়ে।
ইসলামে তাই বিদ্বেষকে একটি জঘন্য পাপ হিসেবে গণ্য করা হয়। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘মধ্য শাবানের রাতে আল্লাহ তাঁর সব সৃষ্টিকে ক্ষমা করে দেন, কেবল মুশরিক ও বিদ্বেষ পোষণকারী ছাড়া।’ (ইবনে মাজাহ)। এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, বিদ্বেষ কতটা ভয়াবহ হলে আল্লাহর সাধারণ ক্ষমা থেকেও বঞ্চিত হতে হয়। তাই ব্যক্তিগত অহংকার ও বিদ্বেষ পরিহার করে সত্যকে গ্রহণ করার মানসিকতা তৈরি করা এবং মানুষকে ভালোবাসাই সুস্থ সমাজ ও উন্নত জীবনের চাবিকাঠি।