ইরানের চলমান অস্থিরতার জন্য সরাসরি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করল হিজবুল্লাহ
লেবাননের সশস্ত্র সংগঠন হিজবুল্লাহ ইরানের বর্তমান অভ্যন্তরীণ সংকটের জন্য সরাসরি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করে একটি বিস্ফোরক বিবৃতি দিয়েছে। সংগঠনটি দাবি করেছে যে ওয়াশিংটন কেবল অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেই ক্ষান্ত হয়নি বরং তারা ইরানের ভেতরকার অস্থিরতাকে উসকে দিচ্ছে। হিজবুল্লাহর মতে মার্কিন মদতেই দেশজুড়ে চলা শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদগুলো ধীরে ধীরে সহিংস রূপ নিচ্ছে এবং অরাজকতা ছড়িয়ে পড়ছে। এই "বিস্ফোরক অভিযোগকে" কেন্দ্র করে বর্তমানে আন্তর্জাতিক মহলে এক নতুন ধরণের কূটনৈতিক উত্তেজনা ও চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে। অনেকেই মনে করছেন এই বিবৃতি মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ সৃষ্টি করতে পারে।
দীর্ঘমেয়াদি ষড়যন্ত্রের নেপথ্যে
হিজবুল্লাহর অভিযোগ অনুযায়ী ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের সময় থেকেই যুক্তরাষ্ট্র ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে দুর্বল করার চেষ্টা চালিয়ে আসছে। তাদের বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে ইরানের নির্বাচিত স্বাধীন শাসন ব্যবস্থাকে ব্যর্থ করে দেওয়াই ওয়াশিংটনের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। মার্কিন নেতৃত্বাধীন বৈশ্বিক চাপ এবং কঠোর অর্থনৈতিক অবরোধকে তারা এই ধ্বংসাত্মক পরিকল্পনার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেখছে। সংগঠনটির দাবি অনুযায়ী বিদেশি শক্তিগুলো ইরানের অভ্যন্তরীণ সার্বভৌমত্ব নস্যাৎ করতে নিয়মিতভাবে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ করে যাচ্ছে। এই দীর্ঘমেয়াদি ষড়যন্ত্রের তত্ত্বটি হিজবুল্লাহর পক্ষ থেকে বরাবরই গুরুত্বের সাথে তুলে ধরা হয়।
সহিংসতার নীল নকশা
সংগঠনটি আরও অভিযোগ করেছে যে ইরানের জনগণের গণতান্ত্রিক প্রতিবাদগুলোকে যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের স্বার্থে একটি সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করছে। ওয়াশিংটনের প্রত্যক্ষ মদতেই সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ওপর সুপরিকল্পিতভাবে হামলা চালানো হচ্ছে বলে তারা জানায়। এর আগে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও ইরানি বিক্ষোভকারীদের আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার জন্য সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ্যে আহ্বান জানিয়েছিলেন। হিজবুল্লাহর মতে মার্কিন প্রশাসনের এই ধরণের উসকানিমূলক আচরণ ইরানের অস্থিতিশীলতাকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে তুলেছে। তারা মনে করে এই বিদেশি হস্তক্ষেপই অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলোকে আরও জটিল করে তুলছে।
মুদ্রাস্ফীতি ও সংকট
উল্লেখ্য যে গত ২৮ ডিসেম্বর থেকে ইরানে মূলত আকাশছোঁয়া মুদ্রাস্ফীতি এবং অর্থনৈতিক মন্দার প্রতিবাদে সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমে এসেছিল। স্থানীয় মুদ্রা রিয়ালের অস্বাভাবিক দরপতনের ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাওয়ায় এই আন্দোলন শুরু হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে এটি একটি অর্থনৈতিক আন্দোলন থাকলেও পরবর্তীকালে তা রাজনৈতিক অস্থিরতার দিকে মোড় নিতে শুরু করে। হিজবুল্লাহ মনে করে এই "অর্থনৈতিক সংকটকেও" যুক্তরাষ্ট্র তাদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। এই সংকটের পেছনে বৈশ্বিক রাজনীতির প্রভাব এখন নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
প্রাণহানি ও পরিসংখ্যান
মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দেওয়া সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী দেশজুড়ে চলা এই সহিংস বিক্ষোভে এখন পর্যন্ত অন্তত ৬৪৬ জন নিহত হয়েছেন। এছাড়াও আন্দোলন দমনের নামে নিরাপত্তা বাহিনী এখন পর্যন্ত ১০ হাজারের বেশি বিক্ষোভকারীকে বিভিন্ন স্থান থেকে আটক করেছে। হিজবুল্লাহর এই বিস্ফোরক দাবি ইরানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির ওপর বিদেশি প্রভাবের বিষয়টি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে এক চরম অনিশ্চয়তা এবং নতুন মেরুকরণের আশঙ্কা দেখা দিচ্ছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। বিশ্ব এখন তাকিয়ে আছে এই অভিযোগের প্রেক্ষিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়ার দিকে।