ফাঁসির ঠিক আগে ইরানি তরুণ এরফান সোলায়ানির মৃত্যুদণ্ড স্থগিত
ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার অভিযোগে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ২৬ বছর বয়সী তরুণ এরফান সোলায়ানির ফাঁসির আদেশ সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে। নরওয়েভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হেনগাও এবং এরফানের পরিবারের পক্ষ থেকে এই স্বস্তিদায়ক খবরটি নিশ্চিত করা হয়েছে। বুধবার ভোরেই তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার কথা ছিল যা শেষ মুহূর্তে আটকে যাওয়ায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। আন্তর্জাতিক মহলে এরফানের জীবন বাঁচানোর জন্য যে আকুতি ছিল তা যেন অবশেষে আলোর মুখ দেখল। পরিবারের সদস্যরা এখন আদালতের পরবর্তী নির্দেশনার জন্য অত্যন্ত উদ্বেগের সাথে অপেক্ষা করছেন।
বিচারের নামে প্রহসন
পেশায় দোকানদার সোলায়ানি তেহরানের উপকণ্ঠে কারাজ এলাকার বাসিন্দা ছিলেন এবং গত ৮ জানুয়ারি তাঁকে বাড়ি থেকে গ্রেফতার করা হয়। বিস্ময়করভাবে মাত্র তিন দিনের একটি সংক্ষিপ্ত ও রুদ্ধদ্বার বিচার প্রক্রিয়ার পরই এই তরুণের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ শাস্তির রায় ঘোষণা করা হয়েছিল। মানবাধিকার সংস্থাগুলো এই বিচার প্রক্রিয়াকে "প্রহসন" হিসেবে অভিহিত করে তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। পুরো বিচার চলাকালীন সময়ে পরিবারের কোনো সদস্য বা আইনজীবীকে আদালতে উপস্থিত থাকার নূন্যতম সুযোগ দেওয়া হয়নি। এই গোপনীয়তা ও তাড়াহুড়ো বিচার বিভাগের নিরপেক্ষতা নিয়ে বড় ধরণের প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
পরিবারের গভীর উৎকণ্ঠা
এরফানের বোন একজন নিবন্ধিত আইনজীবী হওয়া সত্ত্বেও তাঁকে তাঁর ভাইয়ের পক্ষে আইনি লড়াই করার কোনো অনুমতি দেওয়া হয়নি। মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার সময় যত ঘনিয়ে আসছিল পরিবারের সদস্যরা ততই ভেঙে পড়ছিলেন এবং চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছিলেন। এরফানের আত্মীয় সোমায়েহ জানিয়েছেন যে দণ্ড কার্যকর না হওয়ার সংবাদে তাঁরা সামান্য স্বস্তি পেলেও চূড়ান্ত মুক্তি না হওয়া পর্যন্ত তাঁরা আশঙ্কামুক্ত হতে পারছেন না। বর্তমানে তাঁরা প্রতিটি মুহূর্ত পার করছেন পরবর্তী খবরের আশায় এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সাথে যোগাযোগ রাখছেন। একটি সাধারণ পরিবারের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া এই ঝড় এখন তেহরানের রাজপথের প্রতিবাদের প্রতিচ্ছবি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আন্তর্জাতিক চাপের প্রভাব
ঘটনাপ্রবাহে দেখা যায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে এক সংবাদ সম্মেলনে ইরানের বিক্ষোভকারীদের ওপর দমনপীড়ন কমানোর ইঙ্গিত দেওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এই স্থগিতাদেশ আসে। ট্রাম্প মন্তব্য করেছিলেন যে তারা খবর পেয়েছেন ইরান মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা আপাতত বন্ধ রেখেছে যা অত্যন্ত ইতিবাচক একটি পদক্ষেপ। যদিও এই স্থগিতাদেশ সরাসরি আন্তর্জাতিক চাপের ফল কিনা তা নিয়ে সরকারি কোনো বক্তব্য আসেনি তবে বিশ্লেষকরা সময়টির দিকে গুরুত্ব দিচ্ছেন। বৈশ্বিক এই কূটনৈতিক চাপ ও তেহরানের আকস্মিক সিদ্ধান্ত যেন এরফানের জীবনের জন্য আশীর্বাদ হয়ে ফিরে এসেছে। এখন দেখার বিষয় এই পদক্ষেপ দীর্ঘমেয়াদী কোনো পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয় কিনা।
অনিশ্চিত এক ভবিষ্যৎ
মৃত্যুদণ্ড সাময়িকভাবে স্থগিত হলেও এরফান সোলায়ানির মুক্তি বা মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি নিয়ে এখনো ঘোলাটে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। স্থগিতাদেশ মানেই পূর্ণ মুক্তি নয় বরং এটি কেবল একটি সাময়িক বিরতি যা যেকোনো সময় পরিবর্তিত হতে পারে। এরফানের পরিবার এখন আদালতের কাছে প্রার্থনা করছে যেন এই দণ্ড পুরোপুরি বাতিল করে দেওয়া হয় এবং এরফানের স্বাভাবিক জীবনে ফেরার পথ সুগম হয়। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোও ঘোষণা দিয়েছে যে তারা এই মামলার প্রতিটি পদক্ষেপের ওপর নিবিড় নজরদারি বজায় রাখবে। আপাতত কারাগারের অন্ধকারেই এরফানকে অপেক্ষা করতে হচ্ছে তেহরানের পরবর্তী সিদ্ধান্তের জন্য যা নির্ধারণ করবে তাঁর আগামীর দিনগুলো।