লিজ মাইটনার: পারমাণবিক বিভাজনের নেপথ্যের বিজ্ঞানী, যিনি নোবেল থেকে বঞ্চিত
বিজ্ঞান কেবল পরীক্ষাগারের সীমাবদ্ধ গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ থাকে না; তা ছড়িয়ে পড়ে চিঠি, আলোচনা ও গবেষণার আদান-প্রদানের মাধ্যমে। এমনই এক বৈপ্লবিক সময়ে আলোকবর্তিকা হয়ে উঠেছিলেন অস্ট্রিয়ায় জন্ম নেওয়া দুঃসাহসী বিজ্ঞানী লিজ মাইটনার। ভিয়েনায় ১৮৭৮ সালে তাঁর জন্ম হলেও, তাঁর গবেষণার পথ ধরে বিশ্ব দেখেছিল পারমাণবিক শক্তির অপার রহস্যের উন্মোচন।
বিপ্লবী গবেষণার কেন্দ্রবিন্দুতে এক নারীর উত্থান
১৯০৬ সালে ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জনকারী দ্বিতীয় নারী হিসেবে তিনি ইতিহাস সৃষ্টি করেন। এরপর বার্লিনে কর্মজীবন শুরু করার পর বিজ্ঞানী অটো হানের সঙ্গে তাঁর গভীর সংযোগ স্থাপিত হয়। এই যুগলবদ্ধ প্রচেষ্টার ফলস্বরূপ, ১৯১৭ সালে তাঁরা যৌথভাবে প্রোট্যাকটিনিয়াম মৌল শনাক্ত করেন। তাঁর বৈজ্ঞানিক মেধার স্বীকৃতিস্বরূপ, ১৯২৬ সালে তিনি বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম নারী পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক হওয়ার গৌরব অর্জন করেন।
নির্বাসন, পারমাণবিক বিভাজন ও নোবেলের নিষ্ঠুর পরিহাস
১৯৩৮ সাল। নাৎসি শাসনের চরমতম সময়ে জার্মানি ছাড়তে বাধ্য হন লিজ মাইটনার এবং সুইডেনে আশ্রয় নেন। নির্বাসিত জীবন সত্ত্বেও তাঁর গবেষণার গতি কমেনি। এই সময় অটো হান ও ফ্রিটজ স্ট্রাসম্যান ইউরেনিয়ামে নিউট্রন কণা নিক্ষেপের যে পরীক্ষার ফল পান, তার সঠিক তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা প্রদান করেন লিজ মাইটনার এবং তাঁর ভাইপো অটো ফ্রিশ। তাঁরা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করেন যে ইউরেনিয়াম পরমাণু ভেঙে দুটি অংশে বিভক্ত হচ্ছে এবং এই প্রক্রিয়ায় বিপুল পরিমাণ শক্তি নির্গত হচ্ছে। তাঁরা এই পদ্ধতির নাম দেন 'নিউক্লিয়ার ফিশন' বা পারমাণবিক বিভাজন। ১৯৩৯ সালে এই যুগান্তকারী আবিষ্কারটি বিখ্যাত 'নেচার' সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়।
এই আবিষ্কার একদিকে যেমন আধুনিক বিজ্ঞানের দিগন্ত উন্মোচন করে, তেমনি অন্যদিকে যুদ্ধের গতিপথ বদলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। অথচ বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, ১৯৪৪ সালে এই যুগান্তকারী কাজের জন্য নোবেল পুরস্কার পান কেবল অটো হান। লিজ মাইটনারের নাম সম্পূর্ণভাবে বাদ পড়ে যায়। অনেকে মনে করেন, যুদ্ধের সময়কার যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা, রাজনৈতিক চাপ এবং লিঙ্গ বৈষম্যই এর মূল কারণ ছিল।
মানবতার জয়গান, নামাঙ্কিত হলো মৌল
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ সময়ে পারমাণবিক বোমা তৈরির কাজে তাঁকে আহ্বান জানানো হলেও, লিজ মাইটনার দৃঢ়ভাবে তা প্রত্যাখ্যান করে বলেছিলেন, “বোমার সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক থাকবে না।” এই নৈতিক অবস্থান তাঁকে উচ্চতর আসনে স্থাপন করে। নোবেল জয় থেকে বঞ্চিত হলেও, তিনি সর্বোচ্চ বৈজ্ঞানিক সম্মাননা ম্যাক্স প্লাঙ্ক মেডেল এবং এনরিকো ফের্মি পুরস্কার লাভ করেন। তাঁর প্রতি সম্মান জানাতে পর্যায় সারণির ১০৯ নম্বর মৌলটির নামকরণ করা হয় 'মাইটনারিয়াম'। ৬৮ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যুর পর সমাধিতে খোদাই করা হয়েছিল এই অমর বার্তা: “তিনি এমন একজন বিজ্ঞানী, যিনি কখনো তাঁর মানবতা হারাননি।”