সর্বশেষ
Loading breaking news...

অগ্নিঝরা মার্চের সেই হারানো চেতনা: সমষ্টির মুক্তি নাকি ব্যক্তিগত ভোগের লড়াই?

খবরের ছবি
ছবি: সংরক্ষণাগার

একাত্তরের অগ্নিঝরা মার্চের প্রতিটি দিন ও রাত ছিল চরম উৎকণ্ঠা আর মহাতঙ্কের। প্রাণের সংশয় থাকলেও সেই দিনগুলোতে মানুষের ভেতরে ছিল এক সুদৃঢ় সংহতি। ব্যক্তিগত নিরাপত্তার চেয়েও তখন বড় হয়ে উঠেছিল সমষ্টিগত মুক্তির স্বপ্ন। সবাই উন্মুখ হয়ে ছিলেন হানাদার মুক্ত এক নতুন ভোরের প্রত্যাশায়। কিন্তু স্বাধীনতার ৫৪ বছর পর আজ সেই সামষ্টিক স্বপ্নের জায়গা দখল করেছে চরম ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা।

ব্যক্তিগত লাভের পাহাড় ও সমষ্টিগত স্বপ্নের অপমৃত্যু

মুক্তিযুদ্ধের সময় আমাদের লক্ষ্য ছিল স্পষ্ট—দেশের মুক্তি মানেই নিজের মুক্তি। এই ভাবনা থেকেই একাত্তরে সবাই ভেদাভেদ ভুলে এক কাতারে দাঁড়িয়েছিলেন। তবে বিজয়ের পর চিত্রটি বদলে গেছে। বর্তমান সময়ে মানুষ কেবল নিজের প্রাপ্তির হিসাব মেলাতেই ব্যস্ত। দারিদ্র্য দূরীকরণ, শিল্পে বিনিয়োগ কিংবা সুশিক্ষার মতো যে কাজগুলো সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় হওয়ার কথা ছিল, তা আজ অবহেলিত। রাজনৈতিক নেতৃত্ব দেশ স্বাধীন করলেও রাষ্ট্রের পুরনো আমলাতান্ত্রিক কাঠামো ভাঙতে পারেননি। ফলে ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলের সেই একই প্রশাসনিক চরিত্র স্বাধীন বাংলাদেশেও রয়ে গেছে, যেখানে ক্ষমতার চাবিকাঠি জনগণের বদলে আমলাদের হাতেই কুক্ষিগত।

লুণ্ঠনকারী পুঁজিবাদ ও ক্রমবর্ধমান বৈষম্যের মরণকামড়

বর্তমান রাষ্ট্রব্যবস্থায় পুঁজিবাদের যে চর্চা চলছে, তা উৎপাদনের চেয়ে লুণ্ঠনেই বেশি আগ্রহী। একাত্তরের সেই সাম্য ও আত্মত্যাগের মহিমা হারিয়ে গেছে ভোগবিলাস আর ব্যক্তিগত স্বার্থের দৌরাত্ম্যে। ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর মতে, এই আমলাতান্ত্রিক রাষ্ট্র বিনিয়োগের পরিবেশ সৃষ্টি না করে ঘুষ ও দুর্নীতির পথ প্রশস্ত করেছে। এর ফলে সৃষ্টি হয়েছে আকাশচুম্বী বৈষম্য; ধনী আরও ধনী হচ্ছে আর গরিব তলিয়ে যাচ্ছে অতল গহ্বরে। একাত্তরের গৌরবোজ্জ্বল দেশপ্রেম আজ ম্লান হয়ে যাচ্ছে পুঁজিবাদের করাল গ্রাসে।

রাষ্ট্র ও সমাজকে প্রকৃত অর্থে গণতান্ত্রিক করা এবং মুক্তিযুদ্ধের সেই হারানো চেতনা পুনরুদ্ধার করাই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। আমাদের ফিরে তাকাতে হবে সেই ১৯৭১ সালের মার্চের দিকে, যেখানে 'আমি' নয়, 'আমরা' ছিল প্রধান শক্তি। কেবল ব্যক্তিগত সমৃদ্ধি নয়, সমষ্টিগত উন্নয়নই পারে একটি সুখী ও সমৃদ্ধশালী জাতি গঠন করতে।

আজকের এই ক্রান্তিকালে দাঁড়িয়ে আমাদের আত্মোপলব্ধি প্রয়োজন। স্বাধীনতার প্রকৃত স্বাদ কি কেবল গুটিকয়েক মানুষের জন্য, নাকি আপামর জনসাধারণের জন্য—সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার সময় এসেছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে কেবল দিবসভিত্তিক আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না রেখে জাতীয় জীবনের প্রতিটি স্তরে বাস্তবায়ন করতে হবে।

আরও পড়ুন