এক বছরে সড়কে ঝরল সহস্রাধিক শিশুর প্রাণ, প্রশ্নের মুখে নিরাপত্তা ব্যবস্থা
বাংলাদেশের সড়ক-মহাসড়ক যেন ক্রমশই শিশুদের জন্য মৃত্যুফাঁদে পরিণত হচ্ছে। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্যে উঠে এসেছে এক ভয়াল চিত্র, যেখানে দেখা গেছে কেবল ২০২৫ সালেই দেশের সড়কে প্রাণ হারিয়েছে ১ হাজার ৮ জন শিশু। এক মাস থেকে সতেরো বছর বয়সী এই শিশুদের মর্মান্তিক মৃত্যু ভবিষ্যতের প্রজন্মের অস্তিত্বকেই যেন সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে। এই উদ্বেগজনক পরিসংখ্যান নিঃসন্দেহে দেশের ভঙ্গুর সড়ক নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা ও কর্তৃপক্ষের চরম উদাসীনতার দিকেই আঙুল তুলছে।
যাত্রী ও পথচারী হিসেবে ঝুঁকি
মঙ্গলবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই করুণ পরিসংখ্যান তুলে ধরেন সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান। গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি এই প্রতিবেদনে দেখা যায়, নিহত শিশুদের মধ্যে ৫৩৭ জনই ছিল বিভিন্ন যানবাহনের যাত্রী বা শ্রমিক। অন্যদিকে, ৪৭১ জন শিশু পথচারী হিসেবে যানবাহনের চাকায় পিষ্ট হয়ে প্রাণ হারিয়েছে। সড়কের এই বৈষম্যহীন নিষ্ঠুরতা প্রমাণ করে যে, গাড়িতে থাকা অবস্থায় তো বটেই, এমনকি ফুটপাত বা রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময়েও শিশুরা চরম ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
আঞ্চলিক সড়কে মৃত্যুর মিছিল
দুর্ঘটনার স্থান ও ধরণ বিশ্লেষণে দেখা যায়, আঞ্চলিক সড়কগুলোতে শিশুদের মৃত্যুর হার সর্বোচ্চ, যেখানে ৩৬৪টি তাজা প্রাণ ঝরে গেছে। এরপরেই গ্রামীণ সড়কে ২৯১ জন এবং জাতীয় মহাসড়কে ২৮১ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। বয়সভিত্তিতে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ১৩ থেকে ১৭ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরীরাই (৪৪৭ জন) সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে। এছাড়া ৬ থেকে ১২ বছর বয়সী ৩৮২ জন এবং ১ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী ১৭৯ জন শিশু এই এক বছরে সড়কের বলি হয়েছে।
বাড়ির আঙিনাই যখন মৃত্যুফাঁদ
প্রতিবেদনে গ্রামীণ সড়কগুলোর ভয়াবহতা বিশেষভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। মূলত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াত কিংবা বাড়ির আশেপাশে খেলার সময় শিশুরা দুর্ঘটনার কবলে পড়ছে। গ্রামের বাড়িগুলো সাধারণত সড়কের একদম গা ঘেঁষে তৈরি হওয়ায়, দরজা খুললেই শিশুদের সরাসরি দ্রুতগতির যানবাহনের মুখোমুখি হতে হয়। স্থানীয় অবকাঠামোগত ত্রুটি এবং সচেতনতার অভাবে গ্রামীণ জনপদ এখন শিশুদের জন্য এক আতঙ্কের নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতির জন্য মূলত দায়ী ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় আইনের শাসনের অনুপস্থিতি। গ্রামীণ ও আঞ্চলিক সড়কগুলোতে ট্রাফিক পুলিশ বা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নজরদারি না থাকায় চালকরা বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালায়। অন্যদিকে, শিশুদের মধ্যে সড়ক ব্যবহারের মৌলিক জ্ঞান না থাকায় তারাও সহজেই দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে। এই 'মৃত্যুর মিছিল' থামাতে হলে এখনই কঠোর আইনি পদক্ষেপ ও ব্যাপক জনসচেতনতা তৈরির কোনো বিকল্প নেই বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।