সর্বশেষ
Loading breaking news...

প্রতিশ্রুতির চাপ বনাম রাজস্ব সংকট: আইএমএফের শর্তে ইতিহাসের সর্ববৃহৎ ঘাটতি বাজেটের পথে সরকার

খবরের ছবি
ছবি: সংরক্ষণাগার

নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর নির্বাচনী ইশতেহারে দেওয়া জনকল্যাণমুখী প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নের তোড়জোড় শুরু করেছে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিসভা। নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন, কৃষক কার্ড ও ফ্যামিলি কার্ড চালু করার মতো জনবান্ধব উদ্যোগগুলোর জন্য প্রয়োজন বিপুল অঙ্কের অর্থ। তবে একদিকে জনগণের প্রত্যাশার বিশাল চাপ, অন্যদিকে বাণিজ্য স্থবিরতা, রাজস্ব আয়ের শ্লথগতি এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কঠোর শর্ত পূরণের বাধ্যবাধকতা—সব মিলিয়ে আসন্ন বাজেট প্রণয়ন প্রক্রিয়া সরকারকে এক কঠিন বাস্তবতার মুখে দাঁড় করিয়েছে।

অবাস্তব প্রত্যাশা ও কঠোর শর্তের চোরাবালি

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত বাজেটের আকার আট লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা থেকে সাড়ে আট লাখ কোটি টাকার মধ্যে দাঁড়াতে পারে। চলতি অর্থবছরে ঘাটতির পরিমাণ ধরা হয়েছিল দুই লাখ ২৬ হাজার কোটি টাকা, যা নতুন বাজেটে দুই লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। এই ঘাটতি জিডিপির ৪ থেকে ৫ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছানোর ঝুঁকি তৈরি করছে। ফিন্যানশিয়াল এক্সিলেন্স লিমিটেডের চেয়ারম্যান মামুন রশীদ মন্তব্য করেছেন, ক্রমবর্ধমান ব্যয় এবং রাজস্ব ঘাটতির চাপে আগামী বাজেটের অর্থায়ন অত্যন্ত দুরূহ হবে।

বাজেটের আকার বাড়লেও এর মূল ভিত্তি—রাজস্ব আহরণ—দিন দিন দুর্বল হচ্ছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) হালনাগাদ তথ্য বিশ্লেষণ বলছে, অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে রাজস্ব ঘাটতি ইতোমধ্যে ৬০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। সরকার আগামী ১০ মার্চ থেকে পরীক্ষামূলকভাবে ফ্যামিলি কার্ড চালুর ঘোষণা দিয়েছে এবং সরকারি কর্মচারীদের নতুন পে-স্কেল কার্যকর হওয়ায় বেতন-ভাতা খাতে বরাদ্দ প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা বাড়াতে হয়েছে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) তৌফিকুল ইসলাম খান সতর্ক করে বলেছেন, এত বিপুল প্রত্যাশা মেটাতে সরকারের ব্যয় কমানোর সুযোগ নেই, অথচ রাজস্ব আয় বাড়ছে না।

জনগণের প্রত্যাশা পূরণের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে আইএমএফের শর্তাবলী। ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণ কর্মসূচির আওতায় কর-জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধি, ভর্তুকি কমানো এবং ব্যাংক ও বিদ্যুৎ খাতে সংস্কার বাধ্যতামূলক। ভর্তুকি কমানোর এই শর্ত নতুন পে-স্কেল বা কৃষক কার্ডের মতো বড় ব্যয়বহুল উদ্যোগ বাস্তবায়নে বড় বাধা সৃষ্টি করছে। আইএমএফের শর্ত পূরণ না হলে ঋণের পরবর্তী কিস্তি স্থগিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করবে।

রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং উচ্চ সুদহারের কারণে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ স্থবির হয়ে পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, তিনি একটি অংশগ্রহণমূলক বাজেট চান, যার সুফল সরাসরি জনগণের কাছে পৌঁছাবে। তিনি অর্থনীতিকে ‘কঠিন ও স্থবির’ আখ্যা দিয়ে কাঠামোগত সংস্কার এবং বিশ্বাসভিত্তিক পুঁজিবাজার গড়ে তোলাকে অগ্রাধিকার দেবেন বলে জানিয়েছেন। বিশ্লেষকরা বলছেন, কেবল গতানুগতিক বাজেট যথেষ্ট নয়; দাতা সংস্থাগুলোর সঙ্গে জোরালো আলোচনা ও পরিকল্পিত অর্থায়নই এই কঠিন সময় উত্তরণের একমাত্র পথ হতে পারে।

আরও পড়ুন