রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছুটির জটিলতায় শিক্ষকদের চরম ভোগান্তি এবং প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতা
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের ছুটির জন্য এখনো সনাতন পদ্ধতিতে আবেদন করতে হয় যা আধুনিক যুগে অত্যন্ত বেমানান। ছুটির একটি মাত্র আবেদনের জন্য শিক্ষকদের ১৭টি ভিন্ন দপ্তরে সশরীরে উপস্থিত হয়ে ছাড়পত্র সংগ্রহ করতে হয়। এই প্রক্রিয়ায় মূল্যবান সময় নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি শিক্ষকদের চরম ব্যক্তিগত ও পেশাগত হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন যে এই দীর্ঘসূত্রিতা শিক্ষকদের গবেষণামূলক কর্মকাণ্ড এবং উচ্চশিক্ষার পথে বড় ধরণের অন্তরায় সৃষ্টি করছে।
সনাতন পদ্ধতিতে হয়রানি
অনুসন্ধানে জানা গেছে যে একজন শিক্ষককে ছুটি মঞ্জুরের জন্য উপাচার্য ও উপ-উপাচার্যের কার্যালয় থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি পর্যন্ত দৌড়াতে হয়। এমনকি চিকিৎসা কেন্দ্র এবং পরিবহন দপ্তরের পাশাপাশি মসজিদ থেকেও ছাড়পত্র নেওয়ার বিধান রয়েছে যা বর্তমান সময়ে অনেকের কাছেই অপ্রয়োজনীয় মনে হয়। উন্নত বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যখন অনলাইনে ছুটির আবেদন করা যায় সেখানে ১৭টি দপ্তরে সশরীরে হাজিরা দেওয়া অত্যন্ত কষ্টসাধ্য। এই প্রক্রিয়াটি শিক্ষকদের পাঠদানের মনোযোগ নষ্ট করছে এবং প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনাকে স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তুলছে।
ডিজিটালাইজেশনের চরম অভাব
শিক্ষকদের অভিযোগ প্রযুক্তির চরম উৎকর্ষের যুগেও অটোমেশনের অভাবে তাঁদের ভোগান্তি দিন দিন কেবল বাড়ছেই। তাঁরা মনে করেন যে একটি সমন্বিত অটোমেশন প্রক্রিয়া এবং ডিজিটাল ডাটাবেসের মাধ্যমে এই জটিলতা সহজেই কমিয়ে আনা সম্ভব। উদাহরণস্বরূপ লাইব্রেরি বা মেডিকেল সেন্টারে কারো কোনো বকেয়া আছে কিনা তা একটি আইডি সার্চের মাধ্যমেই তাৎক্ষণিক জানা যেতে পারে। কিন্তু "প্রশাসনিক সমন্বয়ের অভাবে" শিক্ষকদের এখনো আলাদাভাবে সশরীরে আবেদন নিয়ে ঘুরতে হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন প্রশাসনিক সমন্বয় ও ডিজিটাল ব্যবস্থা থাকলে শিক্ষকদের এই ভোগান্তি অনেকাংশে হ্রাস করা যেত।
গবেষণার পথে অন্তরায়
বর্তমান ম্যানুয়াল ক্লিয়ারেন্স সিস্টেমটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুষদ সদস্যদের একাডেমিক উন্নতির জন্য একটি বড় বাধা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। যে মূল্যবান সময় ল্যাবরেটরি বা লাইব্রেরিতে ব্যয় হওয়া উচিত ছিল তা ক্যাম্পাসের বিভিন্ন দপ্তরে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা পার করতেই ব্যয় হচ্ছে। অনেক কনিষ্ঠ শিক্ষক জানিয়েছেন যে এই প্রক্রিয়ার শারীরিক ও মানসিক চাপ তাঁদের স্বল্পমেয়াদী গবেষণার ছুটি নিতে নিরুৎসাহিত করে। একটি আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশে বিশ্বমানের শিক্ষা নিশ্চিত করতে নিরবচ্ছিন্ন প্রশাসনিক কাঠামো থাকা অপরিহার্য। এই সেকেলে সংস্কৃতি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি গবেষণামুখী প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে ওঠার পথে বাধা দিচ্ছে।
প্রশাসনিক সংস্কারের আশ্বাস
অভিযোগের প্রেক্ষিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন অবশেষে ডিজিটাল রূপান্তর এবং প্রশাসনিক আধুনিকীকরণের দিকে যাত্রার ইঙ্গিত দিয়েছে। ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ড. ইফতিখারুল আলম মাসউদ জানিয়েছেন যে পরিস্থিতি উত্তরণে "খুব শীঘ্রই ই-নথি ও অনলাইন কার্যক্রম শুরু করা হবে"। এই উদ্যোগ কার্যকর হলে দীর্ঘসূত্রিতা কমবে এবং একাধিক দপ্তরে সশরীরে উপস্থিত হওয়ার প্রয়োজনীয়তা শেষ হবে বলে আশা করা হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমাজ এখন তাদের দীর্ঘদিনের ভোগান্তি অবসানে এই ডিজিটাল ব্যবস্থার বাস্তবায়নের অপেক্ষায় রয়েছেন। শিক্ষকরা আশা করছেন যে এই প্রতিশ্রুতিবদ্ধ অটোমেশন অবশেষে প্রতিষ্ঠানটিকে একবিংশ শতাব্দীতে উন্নীত করবে।