বিশাল এই মহাবিশ্ব মূলত উজ্জ্বল সব জ্যোতিষ্ক আর ছায়াপথের মেলা। তবে এই দৃশ্যমান জগতের সমান্তরালে এমন কিছু গ্যালাক্সি বা ছায়াপথ রয়েছে যা সাধারণ চোখে দেখা তো দূর থাক, শক্তিশালী টেলিস্কোপেও ধরা দেওয়া দায়। সম্প্রতি মহাকাশ বিজ্ঞানের সেই রহস্যের পর্দা সরিয়ে বিজ্ঞানীদের একটি দল সন্ধান পেয়েছেন এক ‘অদৃশ্য’ গ্যালাক্সির, যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘সিডিজি-২’ (CDG-2)। চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো, এই ছায়াপথটির ভরের প্রায় ৯৯ শতাংশই গঠিত হয়েছে রহস্যময় ডার্ক ম্যাটার দিয়ে।
অন্ধকারের গোলকধাঁধায় লুকানো এক মহাজাগতিক বিস্ময়
ডার্ক ম্যাটার মহাকাশ বিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় রহস্যগুলোর একটি। এটি না কোনো আলো প্রতিফলিত করে, না কোনো আলো শোষণ করে; ফলে একে সরাসরি পর্যবেক্ষণ করার কোনো উপায় নেই। ‘দ্য অ্যাস্ট্রোফিজিক্যাল জার্নাল লেটারস’-এ প্রকাশিত এক গবেষণা থেকে জানা গেছে, কানাডার টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ডেভিড লি এবং তার সহযোগী দল এক আধুনিক পরিসংখ্যান পদ্ধতি ব্যবহার করে এই গ্যালাক্সির অবস্থান শনাক্ত করেছেন। গবেষকরা মূলত গ্লোবুলার ক্লাস্টার বা ঘন গোলকার তারাগুচ্ছের সন্ধান করতে গিয়েই এই বিশাল আবিষ্কারের সামনে এসে দাঁড়ান।
গ্লোবুলার ক্লাস্টারের হাত ধরে রহস্যের উন্মোচন
নাসার হাবল স্পেস টেলিস্কোপ, ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সির ইউক্লিড এবং হাওয়াইয়ের সুবুরু টেলিস্কোপ থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে বিজ্ঞানীরা এই আবিষ্কার নিশ্চিত করেছেন। পৃথিবী থেকে প্রায় ৩০ কোটি আলোকবর্ষ দূরে পারসিয়াস গ্যালাক্সি ক্লাস্টারে চারটি অত্যন্ত ঘন গ্লোবুলার ক্লাস্টার আবর্তিত হতে দেখা যায়। এই ক্লাস্টারগুলোর চারপাশে থাকা অত্যন্ত ক্ষীণ আলোই মূলত লুকিয়ে থাকা একটি বিশাল গ্যালাক্সির অস্তিত্বের অকাট্য প্রমাণ দেয়। বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, সিডিজি-২ গ্যালাক্সিটি আমাদের সূর্যের চেয়ে প্রায় ৬০ লাখ গুণ বেশি উজ্জ্বল হলেও এর দৃশ্যমান অংশের ১৬ শতাংশই মূলত গ্লোবুলার ক্লাস্টার দিয়ে গঠিত।
মহাকর্ষীয় টানাপোড়েন ও আগামীর প্রত্যাশা
বিজ্ঞানীদের ধারণা, পার্শ্ববর্তী অন্য কোনো বড় গ্যালাক্সির সঙ্গে প্রবল মহাকর্ষীয় টানাপোড়েনের কারণে এই ছায়াপথের অধিকাংশ সাধারণ দৃশ্যমান পদার্থ মহাকাশে ছিটকে গেছে। তবে গ্লোবুলার ক্লাস্টারগুলো প্রচণ্ড মহাকর্ষ বলের মাধ্যমে শক্তভাবে আটকে থাকায় সেগুলো এখনো অটুট রয়েছে, যা গবেষকদের জন্য এই লুকানো গ্যালাক্সি খুঁজে পাওয়ার সূত্র হিসেবে কাজ করেছে। ভবিষ্যতে ইউক্লিড, ন্যান্সি গ্রেস রোমান স্পেস টেলিস্কোপ এবং ভেরা সি রুবিন অবজারভেটরির মতো অত্যাধুনিক মিশনের মাধ্যমে মহাকাশের এমন আরও অনেক অজানা ও রহস্যময় অধ্যায় উন্মোচিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।