ইসরায়েলি অস্ত্রের ভান্ডারে যুক্তরাষ্ট্রের ২ বিলিয়ন ডলারের গোপন অনুদান ও পেন্টাগনের নথিপত্র
ইসরায়েলকে ট্যাঙ্ক ও সাঁজোয়া যান নির্মাণের জন্য সর্বোচ্চ ২ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত বিশেষ সামরিক সহায়তা দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। সম্প্রতি মার্কিন সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরীণ নথিপত্র ফাঁস হওয়ার পর এই চাঞ্চল্যকর ও স্পর্শকাতর তথ্য আন্তর্জাতিক মহলে প্রকাশ্যে এসেছে। যদি এই বিপুল অঙ্কের সহায়তা শেষ পর্যন্ত কার্যকর হয়, তবে এটি ইসরায়েলের মাটিতে নির্মাণাধীন একটি নতুন সাঁজোয়া যান কারখানার অর্থায়নে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম সামরিক সহায়তাদাতা সংস্থাকে যুক্ত করবে। এর ফলে ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের মধ্যেকার সামরিক শিল্প খাতের সম্পর্ক আরও গভীর ও প্রত্যক্ষ রূপ নেবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
১০ বছরের চুক্তির বাইরে বিশাল অনুদান
মার্কিন সেনাবাহিনীর নথির উদ্ধৃতি দিয়ে ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই বিপুল অর্থ বরাদ্দ হলে তা ইসরায়েলের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বার্ষিক সামরিক সহায়তার পরিমাণকে নাটকীয়ভাবে বাড়িয়ে দেবে। বর্তমানে ১০ বছর মেয়াদি দ্বিপাক্ষিক চুক্তির আওতায় ইসরায়েল প্রতি বছর ৩.৮ বিলিয়ন ডলার সামরিক সহায়তা পেয়ে থাকে যা তাদের সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখতে ব্যবহৃত হয়। এই নতুন ২ বিলিয়ন ডলারের সহায়তা সেই নিয়মিত চুক্তির বাইরে সম্পূর্ণ ‘অতিরিক্ত’ হিসেবে গণ্য হবে বলে নথিতে ইঙ্গিত মিলেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই গোপন তহবিল মূলত ইসরায়েলের নিজস্ব উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে ব্যবহৃত হবে, যা সাধারণ ক্রয়-বিক্রয়ের চেয়ে কৌশলগতভাবে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
গাজা সংঘাতের মাঝেই গোপন অনুমোদন
পাঁচ বছর মেয়াদি এই বিপুল সামরিক উদ্যোগের নাম দেওয়া হয়েছে ‘আর্মার্ড ভেহিকল অ্যাক্সেলারেশন প্রজেক্ট’ যা প্রতিরক্ষা মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো ইসরায়েলের সাঁজোয়া যানের বহর বাড়ানো এবং তাদের নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি মেরকাভা ট্যাঙ্ক, সেই সঙ্গে নেমার ও এইতান ধরনের সাঁজোয়া যান উৎপাদনের গতি বহুগুণ বৃদ্ধি করা। প্রকল্পটি গত আগস্ট মাসে ইসরায়েলি সরকারের প্রতিরক্ষা ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি দ্বারা অনুমোদিত হয়েছিল, ঠিক যখন গাজা ও লেবাননে সংঘাত তীব্র আকার ধারণ করেছে। প্রাথমিকভাবে এই প্রকল্পের ব্যয় প্রায় ১.৫ বিলিয়ন ডলার ধরা হয়েছিল এবং সেসময় কোনো বিদেশি অর্থায়নের কথা জনসমক্ষে উল্লেখ করা হয়নি।
পেন্টাগনের প্রকৌশলীদের প্রত্যক্ষ ভূমিকা
অতিরিক্ত ২ বিলিয়ন ডলারের সহায়তাটি কীভাবে সম্পন্ন হতে পারে, সেই বিষয়ে স্পষ্ট ও নজিরবিহীন ইঙ্গিত মিলেছে মার্কিন সেনাবাহিনীর ফাঁস হওয়া নথিতে। অক্টোবর ও নভেম্বর মাসে যুক্তরাষ্ট্রের আর্মি কোর অব ইঞ্জিনিয়ার্স (ইউএসএসিই)-এর দুটি অভ্যন্তরীণ উপস্থাপনায় প্রকাশ করা হয় যে, এই নির্মাণ প্রকল্পের অর্থায়ন, পরিকল্পনা, নকশা এবং চূড়ান্ত নির্মাণকাজে পেন্টাগন সরাসরি জড়িত থাকতে পারে। কেবল অর্থছাড় নয়, বরং কারিগরি ও অবকাঠামোগত নির্মাণে মার্কিন প্রকৌশলীদের এই সরাসরি অংশগ্রহণ দুই দেশের সামরিক সম্পর্কের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করছে। এটি যুদ্ধের সময়ে দ্রুত উৎপাদন নিশ্চিত করতে মান নিয়ন্ত্রণ ও নকশায় মার্কিন তদারকির বিষয়টিও সামনে আনছে।
আঞ্চলিক উত্তেজনায় সক্ষমতা বৃদ্ধি
ইউএসএসিই সাধারণত যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশ এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর জন্য কারিগরি, প্রকৌশল ও নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করে থাকে যা কৌশলগত মিত্রতা জোরদারে ভূমিকা রাখে। এই ধরনের প্রকল্পগুলোর অর্থায়ন অনেক ক্ষেত্রেই মার্কিন সহায়তা তহবিল বা পেন্টাগনের বিশেষ বরাদ্দ থেকে আসে। এই বিপুল অঙ্কের অতিরিক্ত সামরিক সহায়তা, যা মূলত অস্ত্র উৎপাদন কেন্দ্র নির্মাণের দিকে যাচ্ছে, তা চলমান আঞ্চলিক সংঘাতের মধ্যে ইসরায়েলের সামরিক সক্ষমতাকে আরও বহুলাংশে বাড়িয়ে দেবে। দীর্ঘমেয়াদী স্থলযুদ্ধের জন্য ইসরায়েলকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করে তোলাই এই গোপন মার্কিন পরিকল্পনার মূল উদ্দেশ্য বলে সমরবিদরা মনে করছেন।