বিনাশী মোহে মত্ত মানুষ: অঢেল সম্পদের হাতছানিতে বিসর্জন যাচ্ছে নৈতিকতা
মনোরম এই পৃথিবীর চাকচিক্যে মানুষ আজ দিশেহারা। সম্পদের প্রতি তীব্র আকাঙ্ক্ষা আর দুনিয়াবি লালসা মানুষকে ঠেলে দিচ্ছে অপরাধের অতল গহ্বরে। অন্যায়, জুলুম এবং এমনকি তুচ্ছ পার্থিব স্বার্থে একে অপরকে হত্যা করতেও আজ পিছুপা হচ্ছে না আধুনিক সমাজ। এই মায়াবী জগতের মোহে পড়ে মানুষ দিন দিন নৈতিকতা ও আধ্যাত্মিকতা থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।
মরীচিকার অন্তরালে ধ্বংসের হাতছানি
বিখ্যাত দার্শনিক ইমাম গাজ্জালি (রহ.) সতর্ক করে বলেছেন, দুনিয়ার পেছনে একবার ছুটতে শুরু করলে রক্ষা পাওয়া কঠিন। প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদ অর্জনের নেশা মানুষকে এমন সব কাজে ব্যস্ত করে তোলে, যা তার ধর্মীয় ও নৈতিক জীবনকে বিপর্যস্ত করে দেয়। সম্পদের মোহ আসলে এক মরীচিকা। চাকচিক্য, ঐশ্বর্য আর সাময়িক সুখের আড়ালে এটি মানুষকে মোহাবিষ্ট করে রাখে। অথচ মহান আল্লাহর নির্দেশে এই সুসজ্জিত পৃথিবী একদিন চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যাবে।
পরীক্ষার আড়ালে নৈতিকতার অবক্ষয়
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ রব্বুল আলামিন স্পষ্ট ঘোষণা করেছেন, মানুষের ধনসম্পদ ও সন্তানসন্ততি হলো কেবল একটি পরীক্ষা (সুরা আনফাল, আয়াত ২৮)। কিন্তু এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার চেয়ে পার্থিব ভোগবিলাসে মত্ত হওয়াকেই মানুষ শ্রেয় মনে করছে। ফলে সমাজে ঘুষ, দুর্নীতি, অনাচার আর হিংসা-হানাহানি চরম আকার ধারণ করেছে। অল্পে তুষ্ট থাকার মানসিকতা বিলুপ্ত হয়ে আজ শুরু হয়েছে অসম প্রতিযোগিতা।
অনন্ত জীবনের পথে ক্ষণস্থায়ী মায়া
মানুষের অবাধ্য আচরণই তার বিপর্যয়ের মূল কারণ। সুরা ইউনুসের ২৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহ সাবধান করেছেন যে, পার্থিব জীবনের এই সুখ-শান্তি একেবারেই ক্ষণস্থায়ী। শেষ পর্যন্ত সবার গন্তব্য আল্লাহর কাছে, যেখানে জীবনের প্রতিটি কৃতকর্মের হিসাব দিতে হবে। সম্পদ আজ আছে, কাল নেই; কিন্তু আল্লাহর কাছে থাকা পুরস্কারই কেবল চিরস্থায়ী। সুরা তাকাসুরে বর্ণিত হয়েছে যে, প্রাচুর্যের লালসা মানুষকে ততক্ষণ গাফেল রাখে যতক্ষণ না সে কবরের দেখা পায়।
তাই পরকালীন পাথেয় হিসেবে ‘নেক আমল’ বা সৎ কাজই একমাত্র সম্বল। ক্ষণস্থায়ী এই পৃথিবীতে হাসিতামাশা ও খেলায় মত্ত না হয়ে আন্তরিকতার সঙ্গে সৎ পথে চলাই হবে প্রকৃত বুদ্ধিমানের কাজ। অঢেল সম্পদের হাতছানি আমাদের বিবেককে যেন অন্ধ করে না দেয়, সেই প্রার্থনা ও সচেতনতা আজ জরুরি হয়ে পড়েছে। আখেরাতের পাথেয় সংগ্রহ করাই হোক আমাদের জীবনের প্রধান লক্ষ্য।