সর্বশেষ
Loading breaking news...

বাংলার কোণঠাসা দশা: শাসক শ্রেণির স্বার্থ ও প্রকৃত গণতন্ত্রের সংগ্রাম

খবরের ছবি
ছবি: সংরক্ষণাগার

বাংলা ভাষা আজ বিশ্বের চতুর্থ বৃহৎ মাতৃভাষা হওয়া সত্ত্বেও এর সর্বস্তরে প্রচলনের পথে এক গভীর বাধা বিদ্যমান। ২৫ কোটি মানুষের ভাষা হওয়া সত্ত্বেও কেন বাংলা তার কাঙ্ক্ষিত মর্যাদা পাচ্ছে না—এই প্রশ্নটি বারংবার উঠে এসেছে। অতীতে রাজবুদ্ধি বসুর 'জাতীয় গৌরব সম্পাদনী সভা'-র মতো উদ্যোগ বা নবাব আবদুল লতিফের উর্দু চালুর প্রয়াস—কোনোটাই সফল হয়নি। এই ব্যর্থতার মূল কারণ ছিল রাষ্ট্রক্ষমতার প্রতিকূলতা। যদি রাষ্ট্র আন্তরিকভাবে চাইত, তবে ভাষার প্রচলন ঘটত। কিন্তু বর্তমানে স্বাধীন বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও কেন একই পরিস্থিতি? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাষ্ট্র মুখে বললেও কার্যকরভাবে বাংলা চায় না, কারণ এই রাষ্ট্র এখনো জনগণের রাষ্ট্রে পরিণত হয়নি, বরং শাসক শ্রেণির স্বার্থের দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে।

রাজা ও প্রজার ভাষা

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, রাজার ভাষা এবং প্রজার ভাষা কখনোই এক ছিল না। সংস্কৃত, ফার্সি ও ইংরেজির মতো শাসকের ভাষা বনাম বাংলার মতো প্রজার ভাষার বৈপরীত্য আমাদের ইতিহাসে স্পষ্ট। যদিও বর্তমানে রাজা নেই, কিন্তু শাসক শ্রেণি নিজেদের জনগণের থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছে। তাদের ধনসম্পদ, শিক্ষা, পোশাক-পরিচ্ছদ এবং জীবনযাত্রার মান এতটাই ভিন্ন যে তারা ভাষাকেও পৃথকীকরণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। শাসক শ্রেণি বাংলা নয়, ইংরেজিকে প্রাধান্য দেয়। এর প্রধান কারণ হলো, ইংরেজি ব্যবহারের মাধ্যমে তারা প্রমাণ করতে চায় যে তারা সাধারণ মানুষ নয়। পাশাপাশি, বাংলাদেশের শাসক শ্রেণি বিশ্ব পুঁজিবাদের আজ্ঞাবহ, যার রাষ্ট্রভাষা ইংরেজি। এই শাসক শ্রেণি এবং তাদের আন্তর্জাতিক প্রভুর সঙ্গে স্বচ্ছন্দ যোগাযোগের আকুলতাই বাংলা ভাষার কোণঠাসা দশার মূল কারণ।

লুটেরা শাসক শ্রেণি

বর্তমান বাংলাদেশের অসংখ্য সমস্যার মধ্যে প্রধান চালিকাশক্তি হলো শাসক শ্রেণি—যাদের মধ্যে ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ, আমলা এবং বিত্তবান পেশাজীবীরা অন্তর্ভুক্ত। ব্রিটিশ শাসনকালে যাদের বিকাশের সূত্রপাত, পাকিস্তান আমলে তারা অনুকূল পরিবেশ পায় এবং স্বাধীনতার পর বিস্ময়কর গতিতে ফুলেফেঁপে ওঠে। এদের মূল কাজ উৎপাদন নয়, বরং লুণ্ঠন। ফলে দেশে রাজনীতি পরিণত হয়েছে ক্ষমতা ও সম্পদ নিয়ে এই শ্রেণির অভ্যন্তরীণ নির্লজ্জ কাড়াকাড়িতে। এর বিপরীতে জনগণের কাজ উৎপাদন করা এবং শাসক শ্রেণির নিষ্পেষণ থেকে মুক্তি চাওয়া। একাত্তরের ঐক্যের সুর যুদ্ধের পর দ্রুত মিলিয়ে যায়, যখন বিত্তবান নেতৃত্ব নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারে মগ্ন হয় এবং সমষ্টির স্বার্থ পদদলিত করে ভোগবাদে লিপ্ত হয়।

নির্বাচন এক পঞ্চবার্ষিকী তামাশা

শাসক শ্রেণি বর্তমানে নির্বাচনকেন্দ্রিক কর্মকাণ্ডে অত্যন্ত ব্যস্ত। এই ব্যস্ততা দেখে মনে হচ্ছে নির্বাচনকে ঘিরে কোনো অনভিপ্রেত ঘটনা ঘটার ষড়যন্ত্র চলছে। জনগণ জানে, নির্বাচন মূলত শাসকদের ক্ষমতা ধরে রাখার একটি কৌশল মাত্র। অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে, নির্বাচন জনগণকে মুক্তি দেবে না; এটি কেবল শাসকদের অপকর্ম চালিয়ে যাওয়ার বৈধতা আদায়ের একটি আয়োজন। মানুষের মুক্তি প্রয়োজন শাসক শ্রেণির শোষণ থেকে, প্রয়োজন রাষ্ট্র ও সমাজে প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, যা স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং মানবিক মর্যাদার নিশ্চয়তা দেবে।

মুক্তির একমাত্র পথ

ব্যক্তির মুক্তি কখনোই সমষ্টির মুক্তির বাইরে ঘটতে পারে না। মাতৃভাষার সর্বস্তরে প্রচলন ছাড়া সুস্থ ও স্বাভাবিক সমাজ গঠন সম্ভব নয়, এবং এই ভাষাই বিশ্বায়নের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর একমাত্র স্থান। ভাষার লড়াই মূলত একটি রাজনৈতিক লড়াই, যা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত। রাষ্ট্র যতক্ষণ পর্যন্ত গণমানুষের প্রকৃত প্রতিনিধি না হবে, ততক্ষণ বাংলার কোণঠাসা দশা সাধারণ মানুষের বঞ্চনার প্রতিচ্ছবি হয়েই থাকবে।

আরও পড়ুন