কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়ার সবুজ প্রকৃতিতে রূপালি ডানার ‘রতন’ প্রজাপতির মোহনীয় বিচরণ
কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়ার দিগন্তজোড়া সবুজ প্রকৃতিতে এখন রুপালি ডানার এক মায়াবী হাতছানি। স্থানীয়ভাবে ‘রতন’ নামে পরিচিত এই ক্ষুদ্র প্রজাপতিটি এখন ঝোপঝাড় ও ফসলের ক্ষেতের আলে ডানা মেলেছে। এটি কেবল প্রকৃতির শোভা বর্ধনই করে না, বরং পরিবেশের সুস্থতার এক অনন্য সূচক হিসেবে বিবেচিত হয়। প্রকৃতির এই সুন্দর সৃষ্টিকে দেখতে বর্তমানে দর্শনার্থীরাও ভিড় করছেন ব্রাহ্মণপাড়ার নির্জন গ্রামগুলোতে।
রুপালি ডানার মোহময়ী কারুকাজ
বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন যে এই ক্ষুদ্র পতঙ্গটির বৈজ্ঞানিক নাম ক্যাটোক্রাইসপস প্যানোরমাস এবং এটি লাইসিনিডি পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। ইংরেজিতে একে অত্যন্ত শ্রুতিমধুর ‘সিলভার ফোরগেট-মি-নট’ নামে ডাকা হয় যা এর রূপের সার্থকতা বহন করে। বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্ত ছাড়িয়ে ফিলিপাইন এবং দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়াতেও এই প্রজাতির বিচরণ লক্ষ্য করা যায়। এর ডানার নিখুঁত কারুকাজ যেকোনো প্রকৃতিপ্রেমীর হৃদয় হরণ করতে সক্ষম বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
শারীরবৃত্তীয় বৈশিষ্ট্য ও গঠন
পূর্ণবয়স্ক অবস্থায় এই রতন প্রজাপতি ডানা ছড়ানো অবস্থায় মাত্র ২৫ থেকে ৩৫ মিলিমিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে। এর হালকা ধূসর বা রুপালি-সাদা ডানার ওপর সূক্ষ্ম ঢেউখেলানো নকশা ও কালো দাগ একে বিশিষ্টতা দিয়েছে। ডানার শেষ প্রান্তে থাকা হলদে বা কমলা আভা এই প্রজাপতির আকর্ষণকে বহুগুণ বাড়িয়ে তুলেছে বলে দর্শনার্থীরা জানান। মাথার দুটি সংবেদনশীল শুঁড় ব্যবহার করে এটি তার চারপাশ সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করে এবং মধু সংগ্রহ করে।
অস্তিত্ব সংকটের নেপথ্য কারণ
স্থানীয় স্কুল শিক্ষক রুহুল আমিনের মতে, এক সময় প্রকৃতিতে এদের আধিক্য থাকলেও বর্তমানে কীটনাশকের ব্যবহারে এদের সংখ্যা কমছে। অতিরিক্ত রাসায়নিক প্রয়োগের ফলে ক্ষুদ্র এই প্রাণীদের প্রজনন ক্ষেত্রগুলো ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন। তিনি মনে করেন, "প্রকৃতিকে বাঁচাতে হলে আমাদের এখনই পরিবেশবান্ধব চাষাবাদ পদ্ধতির ওপর জোর দিতে হবে।" অন্যথায় এই অমূল্য সম্পদগুলো অচিরেই বিলুপ্ত হয়ে যাবে।
প্রকৃতির অমূল্য রতন রক্ষা
কৃষিবিদ মো. মাসুদ রানা প্রজাপতির উপস্থিতিকে একটি এলাকার পরিবেশগত ভারসাম্যের ইতিবাচক লক্ষণ হিসেবে দেখছেন। তাঁর মতে, প্রজাপতি পরাগায়নের মাধ্যমে ফসল ও বন্য উদ্ভিদের বংশবিস্তারে অপরিহার্য ভূমিকা পালন করে থাকে। যদিও এদের শুঁয়োপোকা সামান্য পাতার ক্ষতি করে, তবে সেটি প্রাকৃতিক খাদ্যশৃঙ্খলেরই একটি স্বাভাবিক ও নিরবচ্ছিন্ন অংশ। এই ক্ষুদ্র ‘রতন’ প্রজাপতিগুলো আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে প্রকৃতির প্রতিটি সৃষ্টির সুরক্ষা নিশ্চিত করা আমাদের পরম দায়িত্ব।