জাহান্নামের আগুন দুই চোখকে স্পর্শ করবে না রাসুল সাঃ এর বিস্ময়কর ঘোষণা
মানুষের চোখের পানি কেবল আবেগের সাধারণ বহিঃপ্রকাশ নয়, বরং এটি মহান আল্লাহর দরবারে এক অমূল্য সম্পদ। ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গিতে, আল্লাহভীতি ও অনুশোচনা থেকে নির্গত অশ্রু মুমিনের জন্য পরকালীন মুক্তির এক শক্তিশালী হাতিয়ার। পবিত্র কোরআন ও হাদিসের আলোকে জানা যায়, এই চোখের পানিই মুমিন বান্দাকে মহান রবের নৈকট্য অর্জনে সহায়তা করে এবং আখিরাতের কঠিন দিনে নাজাতের পথ প্রশস্ত করে। এটি কোনো দুর্বলতা নয়, বরং ইমানের দীপ্ত সাক্ষর।
পরকালীন মুক্তির অলৌকিক চাবিকাঠি
পবিত্র কোরআনে মুমিনদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হিসেবে আল্লাহর ভয়ে ক্রন্দনকে উল্লেখ করা হয়েছে। সুরা বনি ইসরাঈলে বলা হয়েছে, প্রকৃত ইমানদাররা আল্লাহর ভয়ে কাঁদতে কাঁদতে লুটিয়ে পড়েন, যা তাদের বিনয়কে আরও বাড়িয়ে দেয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) জাহান্নাম থেকে মুক্তির এক বিস্ময়কর সুসংবাদ দিয়েছেন। সুনানে তিরমিজিতে বর্ণিত হাদিস অনুযায়ী, দুটি চোখকে জাহান্নামের আগুন কখনোই স্পর্শ করবে না—একটি চোখ যা আল্লাহর ভয়ে কাঁদে এবং অন্যটি যা আল্লাহর পথে পাহারায় নির্ঘুম রাত কাটায়। এছাড়া, হাশরের ময়দানের ভয়াবহ দিনে, যখন আরশের ছায়া ব্যতীত আর কোনো ছায়া থাকবে না, তখন নির্জনে আল্লাহকে স্মরণ করে চোখের পানি ফেলা ব্যক্তি সেই বিশেষ ছায়ায় আশ্রয় পাবেন।
পাষাণ হৃদয়ের অভিশাপ ও সাহাবাদের অশ্রুসিক্ত রজনী
সাহাবায়ে কেরাম (রা.)-এর জীবনী পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তাঁদের জীবন ছিল আল্লাহভীতি ও চোখের পানিতে সিক্ত। হযরত আবু বকর (রা.) কোরআন তিলাওয়াতের সময় কান্নায় ভেঙে পড়তেন, হযরত ওমর (রা.)-এর গালে কান্নার দাগ স্থায়ী হয়ে গিয়েছিল এবং হযরত আলী (রা.) নামাজে দাঁড়িয়ে এমনভাবে কাঁদতেন যে তাঁর দাড়ি ভিজে যেত। এর সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র হলো অন্তরের কঠোরতা, যাকে রাসুল (সা.) মানুষের দুর্ভাগ্যের অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। পবিত্র কোরআনে কঠিন হৃদয়কে পাথরের চেয়েও নিকৃষ্ট আখ্যা দেওয়া হয়েছে, কারণ পাথর থেকেও কখনো ঝরনা প্রবাহিত হয়, কিন্তু কঠিন অন্তর অনুশোচনায় বিগলিত হয় না। তাই চোখের পানি মুমিনের দুর্বলতা নয়, বরং এটি তার শক্তি ও জাহান্নাম থেকে বাঁচার অন্যতম পাথেয়।
প্রকৃত আনুগত্যের প্রতিফলন
তাঁদের গভীর তাকওয়া ও আল্লাহর সঙ্গে মজবুত সম্পর্কের মাধ্যমে সম্মানিত সাহাবাগণ (রা.) এক অতুলনীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। আল্লাহর স্মরণে অশ্রু বিসর্জন দেওয়ার তাঁদের মানসিকতা তাঁদের ঈমানের গভীরতাকে তুলে ধরে। কুরআন তিলাওয়াতের সময় হযরত আবু বকর (রা.)-এর আবেগাপ্লুত হওয়া এবং হযরত উমর (রা.)-এর চেহারায় কান্নার স্থায়ী দাগ—এগুলো ছিল আন্তরিক অনুশোচনার নিদর্শন। নামাযে হযরত আলী (রা.)-এর অশ্রুসিক্ত হওয়ার ঘটনা তাঁদের গভীর আধ্যাত্মিক সংযোগের সাক্ষ্য বহন করে।
আধ্যাত্মিক উপলব্ধির আহ্বান
এই কাহিনিগুলো বিশ্বাসের ক্ষেত্রে আবেগের অভিব্যক্তির গুরুত্ব সম্পর্কে একটি শক্তিশালী বার্তা দেয়। জাহান্নামের আগুন থেকে দুটি চোখকে রক্ষা করার হাদিসটি আশার আলো দেখায়। এটি বিশ্বাসীদের এমন হৃদয় গঠনের জন্য উৎসাহিত করে যা আল্লাহকে ভয় করে এবং তাঁকে খুশি করে এমন কাজ সম্পাদন করে। কঠিন হৃদয়ের সঙ্গে বৈপরীত্য একটি সংবেদনশীল ও অনুতপ্ত মনোভাব বজায় রাখার তাৎপর্য তুলে ধরে, সব সময় আল্লাহর ক্ষমা ও পথনির্দেশনা কামনা করে।