রমজান কেবল উপবাস নয়: অন্তর ও কর্মে আল্লাহর কাছে সর্বাত্মক আত্মসমর্পণের অলঙ্ঘনীয় নির্দেশিকা
পবিত্র রমজান মাস মুসলিম উম্মাহর জন্য আত্মিক পরিশুদ্ধি ও আনুগত্যের এক অনন্য সুযোগ নিয়ে আসে। তবে ধর্মীয় পণ্ডিতেরা সতর্ক করছেন যে, অনেকেই এই মাসকে কেবল বাহ্যিক ইবাদত-বন্দেগি ও উপবাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখে এর প্রকৃত ফল লাভে ব্যর্থ হন। রমজানের পূর্ণ বরকত পেতে হলে স্রেফ না খেয়ে থাকার পাশাপাশি মন ও মস্তিষ্কে আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আত্মসমর্পণ অপরিহার্য, যেখানে বাহ্যিক ক্রিয়াকলাপের চেয়ে অন্তরের অবস্থা অধিক গুরুত্বপূর্ণ।
আত্মার গভীরে লুকিয়ে থাকা আনুগত্যের মূলমন্ত্র
ইসলামের নির্দেশনা অনুযায়ী, ইবাদতের সময় হৃদয়ের নিবিষ্টতা এবং ঐশী জ্ঞানের প্রয়োগ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের চেয়েও বেশি মূল্যবান। এই বিষয়ে নবীজি (সা.) স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছেন। প্রখ্যাত সাহাবী আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের বাহ্যিক চাল-চলন ও বিত্তবৈভবের প্রতি দৃষ্টিপাত করেন না; বরং তিনি দৃষ্টি দিয়ে থাকেন তোমাদের অন্তর ও আমলের প্রতি।’ সুতরাং, হৃদয়ের একাগ্রতা ছাড়া ইবাদত অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
প্রকৃত অর্থে ইসলাম নির্দেশ করে যে, ইবাদত হবে সর্বতোভাবে আল্লাহর সামনে নিজেকে সঁপে দেওয়ার নাম—হৃদয়, আত্মা, জ্ঞান, চিন্তা এবং যাবতীয় অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মাধ্যমে। একদিকে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দিয়ে ইবাদত করা এবং অন্যদিকে মন-মস্তিষ্ককে আল্লাহ থেকে বিমুখ রাখা ইসলামে কখনোই গ্রহণযোগ্য নয়। ইবাদতের সময় সম্পূর্ণরূপে নিজেকে সমর্পণ করার এই কঠোর বিধান পবিত্র রমজান মাসে আরও বেশি জোরালো হয়ে ওঠে।
সর্বাত্মক আত্মসমর্পণের অব্যর্থ পথ
রমজানকে অন্তরে ধারণ করে নিজেকে সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর দরবারে সমর্পণ করার জন্য বেশ কিছু মৌলিক দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। প্রথমত, আত্মসমালোচনার মাধ্যমে অতীতের ভুলের জন্য ক্ষমা চেয়ে নিজেকে পরিশুদ্ধ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, যে মাসে পবিত্র কোরআন অবতীর্ণ হয়েছে, সেই মাসে আত্মশুদ্ধি ও চিন্তার স্বচ্ছতা অর্জনের মাধ্যমে নতুন জীবনের প্রত্যয় গ্রহণ করতে হবে, যেখানে চোখ, কান ও জিহ্বাও পাপাচার থেকে রোজা রাখবে।
রমজান মাসে কোরআন পাঠ ও অনুধাবনের মাধ্যমে ঐশী জ্ঞানের আলোয় আলোকিত হওয়া একান্ত প্রয়োজন। আত্মসংযম ও পাপ পরিহারের মাধ্যমে মুমিনকে উত্তম গুণে গুণান্বিত হতে হবে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই মাসে অর্জিত নেক আমলের পরিমাণ ও মান রমজানের পরেও বজায় রাখা। ধর্মীয় বিশ্লেষকরা মনে করেন, রমজানের শেষে একজন ব্যক্তির ইবাদতের ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে পারাটাই প্রমাণ করে যে, তিনি আল্লাহর কাছে নিজেকে কতটা সফলভাবে সমর্পণ করতে পেরেছিলেন।