স্মার্টফোনের স্ক্রিনে মরণনেশা: ডার্ক ওয়েবের আড়ালে মাদকের এক অদৃশ্য সাম্রাজ্য
মাদক ব্যবসার সনাতনী প্রেক্ষাপট দ্রুত বদলে যাচ্ছে। অন্ধকার গলি কিংবা নির্জন রাস্তার মোড়ে এখন আর মাদক বিক্রেতাদের আনাগোনা আগের মতো দেখা যায় না; বরং মরণনেশা এখন হানা দিচ্ছে স্মার্টফোনের রঙিন পর্দায় কিংবা কম্পিউটারের মনিটরে। ইন্টারনেটের গহীন জগত ‘ডার্ক ওয়েব’ ব্যবহার করে ইয়াবা ও ক্রিস্টাল মেথ বা আইসের মতো মারাত্মক মাদক ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে সাধারণ মানুষের হাতের নাগালে। প্রযুক্তিনির্ভর এই কৌশলে মরণপণ্য গ্রাহকের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে, আর নেপথ্যে টাকার লেনদেন হচ্ছে মোবাইল ব্যাংকিং ও ক্রিপ্টোকারেন্সিতে।
প্রযুক্তির আবরণে মরণপণ্যের ডিজিটাল ক্যাটালগ
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর নজরদারি এড়াতে মাদক ব্যবসায়ীরা এখন এনক্রিপ্টেড মেসেজিং অ্যাপ ও ডার্ক ওয়েবের বিভিন্ন সাইটে আস্তানা গেড়েছে। ইয়াবা, আইস, গাঁজা ও ফেনসিডিল বিক্রির জন্য তারা ‘হাইড্রা’ বা ‘সিল্ক রোড’-এর মতো নিষিদ্ধ অনলাইন মার্কেটপ্লেস ব্যবহার করছে। এসব সাইটে মাদকের ক্যাটালগ সাজানো থাকে, যেখান থেকে ক্রেতারা তাদের পছন্দের পণ্য অর্ডার করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কিছু গোপন গ্রুপও এই অবৈধ কারবারে যুক্ত রয়েছে। ক্রেতা ও বিক্রেতার পরিচয় গোপন রাখতে ব্যবহৃত হচ্ছে বিশেষ ব্রাউজার ও সাংকেতিক ভাষা।
অর্ডার নিশ্চিত হওয়ার পর পরিচয় গোপন রাখতে ভুয়া নাম-ঠিকানা ব্যবহার করে কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে মাদক পাঠানো হয়। নির্দিষ্ট গন্তব্যে পার্সেলটি পৌঁছানোর পর ক্রেতা তা সংগ্রহ করে নেন, যাতে পাচারকারীর অবস্থান ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকে। লেনদেনের পদ্ধতিটিও বেশ অভিনব। খুচরা চালানের অর্থ সাধারণত মোবাইল ব্যাংকিংয়ে পরিশোধ করা হলেও বড় লেনদেনের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হচ্ছে বিটকয়েন বা মোনেরোর মতো ক্রিপ্টোকারেন্সি। সংগৃহীত টাকা ‘ডিজিটাল হুন্ডি’ পদ্ধতিতে বিদেশে পাচারের বিষয়টিও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরে এসেছে।
তৎপর প্রশাসন: সাইবার নজরদারিতে বিশেষ অভিযান
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয়ের অতিরিক্ত পরিচালক জাহেদ হোসেন মোল্লা জানিয়েছেন, অনলাইন প্ল্যাটফর্মে মাদক কেনাবেচার বিষয়টি তারা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন এবং ইতোমধ্যে বেশ কিছু চালান জব্দ করা হয়েছে। চট্টগ্রাম মেট্রো দক্ষিণ অঞ্চলের উপ-পরিচালক মানজারুল ইসলাম জানান, প্রযুক্তির অপব্যবহার করে মাদক ব্যবসা এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে, সিএমপির মুখপাত্র ও অতিরিক্ত উপকমিশনার আমিনুর রহমান জানিয়েছেন, অনলাইনে মাদকের জাল ছিঁড়ে দিতে সিএমপির সাইবার ইউনিট ও গোয়েন্দা শাখা কাজ করছে। নজরদারি বাড়াতে সাইবার স্পেসে বিশেষ টহল জোরদার করা হয়েছে।