ক্যান্সার চিকিৎসায় নতুন দিশা: ১ কোটি মানুষের জন্য 'হাব-অ্যান্ড-স্পোক' মডেল
৫৫ বছর বয়সী রহিমা বেগম পুরান ঢাকার সূত্রাপুরের বাসিন্দা। স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত এই নারীকে জীবন বাঁচাতে প্রতিদিন যেতে হয় রাজধানীর মহাখালীতে অবস্থিত জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে। অসুস্থ শরীর নিয়ে অসহনীয় যানজটে তাঁর ব্যয় হয় প্রায় ৪ থেকে ৫ ঘণ্টা। এই চরম শারীরিক ও মানসিক ধকল সইতে না পেরে মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যেই তিনি চিকিৎসা ছেড়ে দিতে বাধ্য হন, যা পুরান ঢাকার অসংখ্য ক্যান্সার রোগীর অসহায়ত্বের প্রতিচ্ছবি।
ক্যান্সারের 'অন্ধবিন্দু': ১ কোটির ভিড়, চিকিৎসা অধরা
চকবাজার, লালবাগ, কোতোয়ালি, সূত্রাপুর, গেন্ডারিয়া, শ্যামপুর, ওয়ারী, কামরাঙ্গীরচর ও ডেমরার মতো জনবহুল এলাকায় বসবাসকারী প্রায় ১ কোটি মানুষের জন্য বিশেষায়িত ক্যান্সার চিকিৎসা আজও এক দুর্গম গন্তব্য। প্রশাসনিকভাবে দক্ষিণ ঢাকার অন্তর্ভুক্ত হলেও স্বাস্থ্যসেবার অপ্রতুলতার কারণে বিশেষজ্ঞরা এই অঞ্চলকে জাতীয় স্বাস্থ্যনীতির একটি 'ব্লাইন্ড স্পট' হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। অনিয়ন্ত্রিত কুটির শিল্প থেকে নির্গত রাসায়নিক বর্জ্য, দূষিত পানি ও খাদ্যাভ্যাস এখানকার ক্যান্সারের ঝুঁকিকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
পুরান ঢাকার নিকটবর্তী ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (ডিএমসিএইচ) বিশেষায়িত জনবল ও আধুনিক যন্ত্রপাতির তীব্র সংকট রয়েছে। ফলে বিশাল জনগোষ্ঠীর প্রধান ভরসা মহাখালীর জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট। কিন্তু সেখানে ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত রোগীর চাপে একটি সিরিয়াল পেতে রোগীকে ৪ থেকে ৬ মাস অপেক্ষা করতে হয়। যাতায়াতের ধকল ও দীর্ঘসূত্রতার কারণে প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ রোগী মাঝপথেই চিকিৎসা ছেড়ে দেন, যা তাঁদের অকাল মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
সমাধানের পথ: বিকেন্দ্রীকরণ ও কেরানীগঞ্জে নতুন হাব
এই সীমাবদ্ধতা দূর করতে একটি সমন্বিত 'হাব-অ্যান্ড-স্পোক' (Hub-and-Spoke) মডেল বাস্তবায়নের প্রস্তাব করা হয়েছে। এই মডেলে প্রাথমিক স্তরে নগর স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোতে স্ক্রিনিং এবং মাধ্যমিক স্তরে ঢাকা মেডিকেল ও মিটফোর্ড হাসপাতালকে সমন্বয়কারী কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হবে। আর কেন্দ্রীয় হাব হিসেবে পুরান ঢাকার প্রবেশদ্বার কেরানীগঞ্জে একটি অত্যাধুনিক ও পূর্ণাঙ্গ 'রিজিওনাল ক্যান্সার হাব' গড়ে তোলাই এই পরিকল্পনার মূল ভিত্তি। এটি হবে একটি 'ওয়ান-স্টপ ক্যান্সার সলিউশন' যেখানে লিনিয়ার এক্সিলারেটর ও রোবোটিক সার্জারির মতো সুবিধা থাকবে।
কেরানীগঞ্জের কৌশলগত অবস্থানের কারণে পদ্মা সেতু হয়ে আসা দক্ষিণবঙ্গের মানুষ ঢাকা শহরে প্রবেশ না করেই সরাসরি বিশ্বমানের সেবা গ্রহণ করতে পারবেন। এই মডেল বাস্তবায়নে ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ ও সার্জনদের উচ্চতর প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। ত্রিস্তর বিশিষ্ট এই মডেলের মাধ্যমে প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্ত করা গেলে চিকিৎসার খরচ বহুলাংশে কমে আসবে। বিশেষজ্ঞরা আশা করছেন, এই উদ্যোগ সারা দেশের জন্য একটি অনুকরণীয় 'পাইলট প্রজেক্ট' হিসেবে স্বাস্থ্য খাতের বৈষম্য দূর করতে সক্ষম হবে।