মার্কিন নজরদারি এড়িয়ে হরমুজে অপ্রতিরোধ্য ইরান, নেপথ্যে চীনের অদৃশ্য হাত!
মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ ও সমুদ্র যখন ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র আগুনে জ্বলছে, তখনও আশ্চর্যজনকভাবে সচল রয়েছে তেহরান ও বেইজিংয়ের মধ্যকার জ্বালানি তেলের লাইফলাইন। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিধ্বংসী বিমান হামলা সত্ত্বেও ইরানের তেল বাণিজ্য থেমে নেই। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক রুবেন এফ. জনসনের এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুসারে, যুদ্ধের ডামাডোলের মধ্যেই এক রহস্যময় কৌশলে হরমুজ প্রণালী পেরিয়ে চীনের বন্দরে তেল পৌঁছে দিচ্ছে ইরান।
অন্ধকারে লুকানো মৃত্যুফাঁদ: ছায়া জাহাজের রহস্যময় যাত্রা
তথ্য অনুযায়ী, গত দুই সপ্তাহে প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল হরমুজ প্রণালী অতিক্রম করেছে, যার প্রায় পুরোটাই কাগজে-কলমে চীনের জন্য নির্ধারিত। যেখানে অন্য দেশের জাহাজগুলোর জন্য এই নৌপথ ব্যবহার করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে, সেখানে চীনের ট্যাংকারগুলো যেন এক অলিখিত ‘নিরাপত্তা কবচ’ নিয়ে চলাচল করছে। গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এই তেলের প্রবাহ দেখে রীতিমতো বিস্মিত।
গোয়েন্দা তথ্য ও স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষক সংস্থা ‘ট্যাঙ্কার ট্র্যাকার্স’ জানাচ্ছে, ইরান আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও সামরিক নজরদারি এড়াতে তাদের জাহাজগুলোর ট্রান্সপন্ডার বা অবস্থান শনাক্তকারী যন্ত্র বন্ধ করে দিয়ে ‘অন্ধকারে’ চলাচল করছে। বিশেষজ্ঞদের ভাষায় এই জাহাজগুলোই হলো ‘ডার্ক ফ্লিট’ বা ছায়া বহর। তবে এই লুকোচুরির খেলা অত্যন্ত বিপজ্জনক; সাম্প্রতিক সময়ে এই কৌশলে চলতে গিয়ে অন্তত দশটি জাহাজ হামলার শিকার হয়েছে।
তেলের বিনিময়ে নিরাপত্তা: বেইজিং-তেহরানের অঘোষিত মৈত্রী
বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরানের টিকে থাকার মূল অবলম্বন এখন চীনের জ্বালানি চাহিদা মেটানো। তেহরান জানে, চীনের অর্থনীতিকে সচল রাখতে পারলে বেইজিং আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে তাদের জন্য ঢাল হিসেবে কাজ করবে। অন্যদিকে, চীনও নিজেদের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ইরানের সস্তা তেলের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। এই পারস্পরিক স্বার্থই যুদ্ধের মাঝে তেলের সরবরাহ সচল রেখেছে।
সামরিক চাপ সামলাতে ইরান ওমান উপসাগরের ‘জাস্ক’ টার্মিনাল ব্যবহার বাড়িয়েছে, যা হরমুজ প্রণালীর বাইরে অবস্থিত হওয়ায় তুলনামূলক নিরাপদ। মার্কিন নৌবাহিনীর বিমানবাহী রণতরীগুলো পরিস্থিতির ওপর নজর রাখলেও হরমুজে চীনের স্বার্থে আঘাত করা একটি বড় কূটনৈতিক ঝুঁকি। বেইজিং আনুষ্ঠানিকভাবে নীরব থাকলেও পর্দার আড়ালে নিজেদের তেলের সরবরাহ নিশ্চিত করছে, যা বিশ্ব অর্থনীতির এক জটিল সমীকরণ তৈরি করেছে।