নামাজ-রোজায় পূর্ণতা পেলেও নাগরিক দায়িত্ব পালনে কেন আমরা পিছিয়ে? রমজানের অন্তরালে এক জরুরি আত্মজিজ্ঞাসা
রমজান মাস কেবল ব্যক্তিগত ইবাদত বা উপবাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি আত্মিক ও সামাজিক শৃঙ্খলার এক অনন্য প্রশিক্ষণকাল। ক্ষুধা ও তৃষ্ণা সহ্যের মাধ্যমে সংযম, ধৈর্য এবং গভীর দায়িত্ববোধের শিক্ষা নেন রোজাদাররা। তবে প্রশ্ন উঠছে, এই সুমহান শিক্ষা কি আমাদের দৈনন্দিন নাগরিক জীবনে প্রতিফলিত হচ্ছে? ব্যক্তিজীবন থেকে শুরু করে অফিসের ব্যস্ত ডেস্ক পর্যন্ত রোজার সেই আদর্শ কতটা কার্যকর হচ্ছে, তা নিয়ে আজ নতুন করে ভাববার সময় এসেছে। পবিত্র কোরআনের সুরা নাহলের ৯০ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ ন্যায়বিচার ও সদাচরণের নির্দেশ দিয়েছেন, যা কেবল বিচারালয় নয়, বরং রাস্তাঘাট থেকে শুরু করে পারিবারিক ও সামাজিক সব ক্ষেত্রেই সমভাবে প্রযোজ্য।
ইবাদত বনাম অস্থিরতা: রাজপথ ও কর্মক্ষেত্রে তাকওয়ার প্রকৃত পরীক্ষা
রোজার অন্যতম মূল উদ্দেশ্য হলো নিজের নফস বা প্রবৃত্তির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু বাস্তব চিত্র অনেক ক্ষেত্রেই এর বিপরীত। আমরা দেখি রাস্তায় ট্রাফিক আইন ভঙ্গের প্রবণতা, সামান্য অজুহাতে বাগবিতণ্ডা এবং বেপরোয়া ব্যবহারের এক অস্থির চিত্র। অথচ সহিহ বুখারির হাদিস অনুযায়ী, রাসুলুল্লাহ (সা.) নির্দেশ দিয়েছেন যে, রোজাদার যেন কোনো অবস্থায়ই অশ্লীল কথা না বলে বা মূর্খতায় লিপ্ত না হয়; এমনকি কেউ গালি দিলেও তাকে মনে করিয়ে দিতে হবে যে সে রোজাদার। এই ধৈর্য কেবল ইবাদতখানায় নয়, বরং জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে প্রয়োগ করাই রমজানের দাবি। অথচ আধুনিক নাগরিক জীবনে সেই সহনশীলতার অভাব প্রকট হয়ে উঠছে।
জবাবদিহিতার কাঠগড়ায় নাগরিক সততা
নাগরিক দায়িত্বের একটি বড় অংশজুড়ে রয়েছে কর্মক্ষেত্র। অফিসে সময়মতো উপস্থিতি, সততা এবং দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজ সম্পন্ন করাও ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত। সুরা সাফফাতের ২৪ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘তাদের থামাও, তারা জিজ্ঞাসিত হবে।’ অর্থাৎ প্রতিটি দায়িত্বের জন্যই পরকালে জবাবদিহি করতে হবে। অফিসের কাজে গাফিলতি বা দুর্নীতি মূলত রোজার আত্মিক শিক্ষাকেই অবমাননা করে। ক্ষুধা যদি আমাদের দরিদ্রের অভাব বুঝতে শেখায়, তবে কর্মক্ষেত্রে কেন আমরা অন্যের অধিকার হরণ করি কিংবা দায়িত্ব এড়িয়ে চলি? প্রকৃত রোজা তখনই সার্থক হবে, যখন তাকওয়ার আলোতে আমাদের পেশাগত জীবনও উদ্ভাসিত হবে।
রমজান মাস একদিন শেষ হয়ে যাবে, কিন্তু নাগরিক জীবন চলবে বছরজুড়ে। তাই এই পবিত্র মাসের শিক্ষাকে কেবল মসজিদের চার দেয়ালে আটকে না রেখে বাজার, অফিস, আদালত এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিটি স্তরে ছড়িয়ে দেওয়া প্রয়োজন। নাগরিক দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন একটি সমাজই হতে পারে রমজানের শ্রেষ্ঠ ফসল। সেই আদর্শ সমাজ গড়ার চ্যালেঞ্জ এখন আমাদের সবার সামনে, যার সূচনা হতে পারে আজ আমাদের আত্মশুদ্ধির মাধ্যমেই।