সুপারসনিক গতিতে ১৩৩ অধ্যাদেশ জারি: সংসদের অগ্নিপরীক্ষা ও কালো আইন বাতিলের চাপ
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তাদের ১৮ মাসের মেয়াদকালে অভূতপূর্ব গতিতে ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি করে রেকর্ড সৃষ্টি করেছে। এর অর্থ দাঁড়ায়, প্রতি বছর গড়ে ৮৮টি অধ্যাদেশ প্রণয়ন, যা স্বাভাবিক সংসদীয় আইন প্রণয়নের গড়ের তুলনায় ১৩২ শতাংশ বেশি। সরকারের শেষ দেড় মাসে মাত্র ৪৭ দিনে ৩৬টি অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে এই গতির চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটে। কার্যত প্রতিদিন গড়ে একটি করে নতুন অধ্যাদেশ জারির নজির স্থাপিত হয়েছে।
আইন প্রণয়নের ‘সুপারসনিক গতির’ নেপথ্যে উদ্বেগ
সংসদীয় প্রক্রিয়ার বাইরে অধ্যাদেশের মাধ্যমে এত দ্রুত বিপুল সংখ্যক আইন প্রণয়ন নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সিনিয়র আইনজীবীরা। সিনিয়র আইনজীবী শাহ্দীন মালিকের মতে, এত অল্প সময়ে অধ্যাদেশ জারি হওয়ার অর্থ দাঁড়ায় প্রতিটি অধ্যাদেশের জন্য গড়ে পাঁচ দিনেরও কম সময় ব্যয় করা হয়েছে। নতুন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনেই এই ১৩৩টি অধ্যাদেশ উপস্থাপন করতে হবে। অধ্যাদেশের নিয়ম অনুযায়ী, সংসদে উত্থাপনের পর এগুলোর কার্যকারিতা মাত্র ৩০ দিন। এই স্বল্প সময়ে সকল অধ্যাদেশ পাস করা সংসদের জন্য বিশাল চ্যালেঞ্জ।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ড. ইউনূসের প্রশাসন বিচার বিভাগ ও নাগরিক অধিকার সুসংহত করার কথা বললেও এই আইনের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। এত দ্রুত আইন প্রণয়ন করতে গিয়ে যথাযথ পর্যালোচনা ও জনমতের প্রতিফলন ঘটানো সম্ভব হয়নি বলে অনেকে মনে করেন। এখন দেখার বিষয়, নতুন নির্বাচিত সংসদ এই আইনগুলোকে কীভাবে গ্রহণ করবে এবং কোনগুলো বাতিল করবে।
বিতর্কিত ‘ভূমি আইন’: কৃষক ও উন্নয়নবিরোধী কালো ছায়া
অধ্যাদেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বিতর্কিত হয়েছে ‘ভূমি ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ ও কৃষিভূমি সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৬’। গত ১৯ জানুয়ারি নির্বাচনের ঠিক আগে তাড়াহুড়ো করে জারি হওয়া এই আইনটিকে বিভিন্ন মহলে ‘কালো আইন’ হিসেবে আখ্যা দেওয়া হচ্ছে। অভিযোগ উঠেছে, একটি বিশেষ গোষ্ঠীর স্বার্থ উদ্ধারের জন্য এই কৃষকবিরোধী ও উন্নয়নবিনাশী আইনটি প্রণয়ন করা হয়েছে যা কৃষকদের মৌলিক অধিকার খর্ব করবে এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা বাড়াবে।
এই অধ্যাদেশে কৃষিভূমির অস্পষ্ট সংজ্ঞার কারণে ভবিষ্যতে শহর সম্প্রসারণ, শিল্পায়ন এবং বড় অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পগুলো অযৌক্তিক বাধার মুখে পড়বে। আইন বিশেষজ্ঞরা জোরালোভাবে দাবি করছেন, জাতীয় সংসদের উচিত হবে প্রতিটি অধ্যাদেশের যৌক্তিকতা পুঙ্খানুপুঙ্খ যাচাই করা। যেসব অধ্যাদেশ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং জনগণের স্বার্থের পরিপন্থী, সেগুলোকে বাতিল করে জনগণকে কালো আইনের শৃঙ্খল থেকে মুক্তি দিতে হবে।