মৃত্যুর শরবত: নবী ইয়াহইয়ার কাহিনিতে কুরআনের যে বাক্যটি বদলে দিল গভীর দর্শন!
পবিত্র কোরআন এক জীবন্ত অলৌকিকতা—যার প্রতিটি শব্দ গভীর সমুদ্রের চেয়েও বিশাল। যদি পৃথিবীর সমস্ত জল কালি হতো এবং সমস্ত বৃক্ষ কলমে রূপান্তরিত হতো, তবুও কালামে হাকিমের একটি শব্দের পূর্ণ ব্যাখ্যা লেখা মানুষের সামর্থ্যের অতীত। সম্প্রতি এক ধর্মীয় সমাবেশে এক প্রবীণ আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব নবী ইয়াহইয়া (আ.)-এর জীবন নিয়ে এমন এক উপলব্ধির কথা তুলে ধরেন, যা শ্রোতাদের গভীরভাবে নাড়া দেয়।
রহস্যময় ‘ইয়ামুতু’ শব্দের আড়ালে লুকানো প্রস্তুতি
আলোচিত আয়াতটিতে বলা হয়েছে: “ইয়াহইয়ার ওপর শান্তি বর্ষিত হোক যেদিন সে জন্মগ্রহণ করেছিল, যেদিন সে মারা যাবে এবং যেদিন তাকে কবর থেকে ওঠানো হবে।” নবী ইয়াহইয়া (আ.) ছিলেন নবী জাকারিয়া (আ.)-এর পুত্র। জাকারিয়া (আ.) যখন বৃদ্ধ বয়সে এবং তাঁর স্ত্রী বন্ধ্যা থাকা সত্ত্বেও সন্তানের জন্য আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেন, তখন আল্লাহ সেই দোয়া কবুল করেন। ‘ইয়াহইয়া’ শব্দের অর্থ হলো ‘জীবিত’, কারণ তিনি তাঁর মৃতপ্রায় মায়ের গর্ভকে পুনরুজ্জীবিত করেছিলেন।
নবী ইয়াহইয়ার অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল ‘হানানা’ বা চরম কোমলতা; যা তাঁকে সৃষ্টির প্রতি তীব্র দরদ ও সহানুভূতি দিয়েছিল। তাঁর জীবন ছিল পিতা-মাতার প্রতি আনুগত্য এবং আল্লাহর প্রতি নিবেদিত। এই সকল গুণের ফলস্বরূপ, আয়াত অনুসারে তিনি জন্ম, মৃত্যু ও পুনরুত্থান—সর্বত্রই শান্তির অধিকারী হবেন। এই আয়াতের বিশেষ শব্দবিন্যাস মৃত্যুর দার্শনিক দিককে অন্যভাবে উপস্থাপন করেছে।
কর্মবাচ্য ও কর্তৃবাচ্যের ভাষাগত বিভেদ: মৃত্যুর নিয়ন্ত্রণ কার হাতে?
ভাষাবিদরা এই আয়াতের শব্দচয়নের সূক্ষ্মতা তুলে ধরেছেন। নবী ইয়াহইয়ার জন্মের ক্ষেত্রে ‘উলিদা’ এবং পুনরুত্থানের ক্ষেত্রে ‘ইউবআছু’—এই দুটি শব্দই আরবি ব্যাকরণে ‘মাজহুল’ বা কর্মবাচ্যের রূপ নিয়েছে। অর্থাৎ, জন্ম ও পুনরুত্থানের কর্তা তিনি নিজে নন, বরং তা আল্লাহর দ্বারা সংঘটিত। কিন্তু সবচেয়ে বিস্ময়কর হলো মৃত্যুর ক্ষেত্রে ব্যবহৃত ক্রিয়াপদ—‘ইয়ামুতু’, যা কর্তৃবাচ্যের রূপ।
এর গভীর অর্থ হলো, নবী ইয়াহইয়া (আ.) নিজেই তাঁর শান্তিপূর্ণ মৃত্যুর পথ রচনা করেছেন। তিনি তাঁর নিরন্তর খেদমত, মানুষের প্রতি মমতা এবং আল্লাহর প্রতি ভয়ের মাধ্যমে একটি সুন্দর সমাপ্তি নিশ্চিত করেছিলেন। মৃত্যু আল্লাহর হাতে থাকলেও মানুষের আমলই নির্ধারণ করে সেই মৃত্যু যন্ত্রণাদায়ক হবে নাকি শান্তির চাদরে মোড়ানো। আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব এই ভাষাগত অলৌকিকতার মাধ্যমে জীবনের চূড়ান্ত প্রস্তুতির কথা মনে করিয়ে দেন।
আলোচনার উপসংহারে বলা হয়, যে শিক্ষার্থী সারা বছর নিয়মমাফিক পড়াশোনা করে, তার জন্য বার্ষিক পরীক্ষা অত্যন্ত সহজ হয়ে যায়। ইয়াহইয়া নবীর মতো আমাদের প্রত্যেকেরই এখন থেকেই মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি নেওয়া উচিত। আল্লাহর নিকট প্রার্থনা, যেন আমাদের সকলের মৃত্যু শান্তিপূর্ণ হয় এবং আমরা যেন সুন্দর পুনরুত্থানের জন্য সর্বদা প্রস্তুত থাকতে পারি। এই বোধই মুমিনের জীবনের মূল চালিকাশক্তি হওয়া উচিত।