সর্বশেষ
Loading breaking news...

রক্তের দামে কেনা স্বাধীনতা ও নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন: ইতিহাসের বাঁক বদলের গল্প

খবরের ছবি
ছবি: সংরক্ষণাগার

কালের পরিক্রমায় আবারও আমাদের মাঝে ফিরে এসেছে অগ্নিঝরা মার্চ। বাংলাদেশের জাতীয় জীবনে এই মাসটির তাৎপর্য ও গভীরতা অপরিসীম। মার্চ মাস এলেই প্রতিটি বাঙালির মানসপটে ভেসে ওঠে গৌরবোজ্জ্বল স্বাধীনতা সংগ্রামের স্মৃতি। আত্মমর্যাদাশীল কোনো জাতিই পরাধীনতার গ্লানি নিয়ে বাঁচতে চায় না; তবে স্বাধীনতা কেবল চাইলেই পাওয়া যায় না, এর জন্য দিতে হয় চরম মূল্য। ভারতীয় উপমহাদেশের অন্য যেকোনো অঞ্চলের মানুষের চেয়ে বাংলাদেশের মানুষ রাজনৈতিকভাবে অনেক বেশি সচেতন ও স্বাধীনতাপ্রিয়। স্বাধীনতার জন্য এ দেশের মানুষ যে পরিমাণ রক্ত ও ত্যাগ স্বীকার করেছে, তা ইতিহাসের পাতায় বিরল।

ব্রিটিশদের গোপন ভীতি ও রাজনৈতিক সচেতনতা

ব্রিটিশ শাসনামলেও বাংলার মানুষের এই স্বাধীনতাকামী মনোভাব শাসকদের চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ব্রিটিশদের গোপন নথিপত্রে উল্লেখ ছিল, 'বাংলার মানুষ আজ যা ভাবে, ভারতের অন্য অঞ্চলের মানুষ তা ভাবে আগামীকাল।' ব্রিটিশরা শঙ্কিত ছিল যে, বাঙালিরা ঐক্যবদ্ধ থাকলে তাদের শাসন টিকিয়ে রাখা অসম্ভব হবে। এই ভীতি থেকেই ১৯০৫ সালে তারা বঙ্গভঙ্গ করে, যদিও প্রশাসনিক কারণকে লোকদেখানো অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল। ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে পাকিস্তান সৃষ্টির সময়ও বাঙালিদের সাথে প্রতারণা করা হয়। তবুও ধর্মীয় ঐক্যের আশায় বাঙালিরা পাকিস্তান মেনে নিয়েছিল, কিন্তু রাষ্ট্রভাষা প্রশ্নে সেই মোহ দ্রুতই কেটে যায়। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনই ছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদের মূল ভিত্তি, যা পরবর্তীতে একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধে রূপ নেয়।

রক্তস্রোত, জিয়াউর রহমানের ঘোষণা ও একজন শিক্ষকের রণাঙ্গন

১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ কালরাত্রে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যখন ঘুমন্ত বাঙালির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, তখন জাতি সাময়িক দিকভ্রান্ত হয়ে পড়েছিল। শেখ মুজিবুর রহমানের গ্রেপ্তার এবং আওয়ামী লীগ নেতাদের আত্মগোপনে যাওয়ায় সাধারণ মানুষ নেতৃত্বের শূন্যতা অনুভব করছিল। ঠিক সেই ক্রান্তিলগ্নে, ২৭শে মার্চ ইথারে ভেসে আসে মেজর জিয়ার বজ্রকণ্ঠ। তৎকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক তরুণ শিক্ষকের মতে, মেজর জিয়ার সেই স্বাধীনতার ঘোষণা জাদুমন্ত্রের মতো কাজ করেছিল এবং দিশেহারা জাতিকে যুদ্ধের অনুপ্রেরণা যুগিয়েছিল। সেই উত্তাল দিনগুলোতে সাধারণ মানুষ কীভাবে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিলেন, তা এক অনন্য ইতিহাস। দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম ও লাখো শহীদের ত্যাগের বিনিময়ে অবশেষে ১৬ই ডিসেম্বর অর্জিত হয় কাঙ্ক্ষিত বিজয়।

স্বপ্নভঙ্গের বেদনা ও আগামীর সম্ভাবনা

স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে দেশগড়ার যে স্বপ্ন মানুষ দেখেছিল, তা খুব দ্রুতই হোঁচট খায়। জাতীয় সরকার গঠন না করে একদলীয় শাসন, বাকস্বাধীনতা হরণ, দুর্নীতি এবং ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ নবগঠিত দেশকে বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দেয়। ১৯৭৫ সালে বাকশাল কায়েম এবং পরবর্তীতে ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যায়। তবে ইতিহাসের নির্মম পরিহাসে স্বৈরাচারী কায়দায় দেশ পরিচালনার পরিণতি হিসেবে সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে ক্ষমতা ছেড়ে দেশত্যাগ করতে হয়েছে। বর্তমানে একটি গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে নতুন সরকারের সামনে সুযোগ এসেছে একটি বৈষম্যহীন ও আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের। জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে যে জাতীয় ঐক্য গড়ে উঠেছে, তাকে ধারণ করে এগিয়ে যেতে পারলেই সার্থক হবে লাখো শহীদের রক্তদান।

আরও পড়ুন